ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের লক্ষ্যেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের 'মহাক্রোধ' অভিযান
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের 'মহাক্রোধ' অভিযান
ছাবেদ সাথী: ‘মহাক্রোধ' (এপিক ফিউরি) নামে অভিযানে শনিবার ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের লক্ষ্যেই এই বড় সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।
ইরানে সূর্যোদয়ের পরপরই হামলা শুরু হয়। রাজধানী তেহরানে বড় বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ভিডিওতে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে দেশের সার্বভৌমত্বের “জঘন্য লঙ্ঘন” বলে আখ্যা দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক ও বেসামরিক উভয় লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানায়, দেশজুড়ে হামলায় ২০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।
তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলের এক বাসিন্দা ফোনে বলেন, 'আমার আশপাশে বহু জায়গায় হামলা হয়েছে, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের শব্দ শুনছি।' পরে ইরানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন। 'মানুষ আতঙ্কে বাড়ির দিকে ছুটছে। শিশুরা স্কুল থেকে বেরিয়ে দৌড়াচ্ছে,' তিনি জানান।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দক্ষিণ ইরানের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিমান হামলা হয়েছে এবং স্থানীয় প্রসিকিউটর দপ্তরের বরাতে অন্তত ৮৫ শিশু নিহত হয়েছে। আরও অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে দাবি করা হয়। শনিবারই ইরানে স্কুল ও কর্মসপ্তাহ শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কাছে মন্তব্য চাওয়া হয়েছে।
ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যার ফলে সংঘাত আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলে বিমান হামলার সাইরেন বাজতে থাকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ইরানি হামলার খবর জানায়। জর্ডান সরকার জানায়, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ৪৯টি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে।
ট্রুথ সোশালে প্রকাশিত আট মিনিটের এক ভিডিওতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হলো ইরানি শাসনের তাৎক্ষণিক হুমকি নির্মূল করে আমেরিকান জনগণকে রক্ষা করা।'
হামলার আগে উত্তেজনা
পেন্টাগন অভিযানের নাম দেয় 'এপিক ফিউরি', আর ইসরায়েল একে বলে 'রোরিং লায়ন'। কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনা ও অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সমাবেশের পর এই হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে আলোচনার কথা বললেও, ট্রাম্প জানান, জেনেভায় বৃহস্পতিবারের আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন, ট্রাম্প হয়তো সীমিত হামলায় যাবেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য ও প্রাথমিক হামলার ধরন ইঙ্গিত দেয় বৃহৎ ও অনির্দিষ্টকালীন অভিযান।
ট্রাম্প বলেন, 'আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব এবং ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেব। তাদের নৌবাহিনীও ধ্বংস করব।'
তিনি দাবি করেন, ইরান আবার পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলছিল। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুনরায় শুরু করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “অস্ত্র ফেলে দিন। নতুবা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন।”
ভিডিওতে তিনি ইরানি জনগণকে সাময়িকভাবে আশ্রয়ে থাকতে বলেন এবং বোমাবর্ষণ শেষে “নিজেদের সরকার দখলে নেওয়ার” আহ্বান জানান। তবে সাম্প্রতিক মাসে ইরানে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের পর গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শত শত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিমান অভিযান সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান পশ্চিম ও মধ্য ইরানে প্রায় ৫০০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র রয়েছে।
এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানান, মাসের পর মাস লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি করা হয়েছিল এবং উচ্চপর্যায়ের ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠকের সময় হামলা চালানো হয়। তিনি দাবি করেন, একাধিক কেন্দ্রীয় সরকারি ব্যক্তি নিহত হয়েছেন, যদিও নাম প্রকাশ করেননি।
আরেক সূত্রের দাবি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে ছিলেন। তবে এ তথ্য নিশ্চিত হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, তার জানা মতে খামেনি ও প্রেসিডেন্ট জীবিত আছেন।
নেতানিয়াহু বলেন, এই যৌথ হামলার উদ্দেশ্য 'ইরানের সন্ত্রাসী শাসনের অস্তিত্বগত হুমকি দূর করা।'
ইসরায়েল ও উপসাগরে সতর্কতা
ইসরায়েল সব বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় এবং ৪৮ ঘণ্টার জরুরি অবস্থা জারি করে। নাগরিকদের বাঙ্কারে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তেল আবিবের আকাশে ধোঁয়ার রেখা দেখা যায়, যখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে। মধ্য ইসরায়েলের একটি হাসপাতাল ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত স্থানে কার্যক্রম সরিয়ে নেয়।
উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানি হামলার বিবরণ দেয়। বাহরাইন জানায়, মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, তারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে, তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষে আবুধাবিতে এক এশীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন।
মার্কিন স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো ইঙ্গিত নেই, এবং বিশ্লেষকদের মতে কেবল বিমান হামলা দিয়ে শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা অত্যন্ত কঠিন হবে। ফলে সংঘাতের পরিণতি এখনও অনিশ্চিত।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
নিউ ইয়র্কে হাসপাতাল অবরুদ্ধকালে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে ৯ জন গ্রেপ্তার
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি