যুক্তরাষ্ট্রে উপাসনার অধিকার খর্ব করা যাবে না
যুক্তরাষ্ট্রে উপাসনার অধিকার খর্ব করা যাবে না
ছাবেদ সাথী
যুক্তরাষ্ট্রে সিনাগগ বা ইহুদি উপাসনালয়গুলো বারবার হামলা ও বিশৃঙ্খলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। মাত্র কয়েক দিন আগে নিউইয়র্ক সিটির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সেন্ট্রাল সিনাগগে ‘কাব্বালাত শাব্বাত’ প্রার্থনা চলাকালে এক ব্যক্তি সহিংসভাবে একজন উপাসনাকারী ও একজন নিরাপত্তারক্ষীর ওপর হামলা চালালে প্রার্থনায় বিঘ্ন ঘটে।
গত নভেম্বরে ম্যানহাটনের পার্ক ইস্ট সিনাগগে প্রার্থনায় আসা ব্যক্তিদের প্রায় ২০০ বিক্ষোভকারীর মুখোমুখি হতে হয়। বিক্ষোভকারীরা ‘ইন্তিফাদা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দাও’, ‘আইডিএফের মৃত্যু হোক’ এবং ‘তাদের ভয় পাইয়ে দিতে হবে’—এমন স্লোগান দেয়। ফলে সিনাগগে আসা মানুষদের ইহুদিবিদ্বেষী গালিগালাজ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়।
এরপর মে মাসে আবারও সেখানে হয়রানির ঘটনা ঘটে। এবার বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ হিজবুল্লাহর পতাকা প্রদর্শন করে এবং সিনাগগে প্রবেশের চেষ্টা করা ইহুদিদের উদ্দেশে ‘ধর্ষক’ ও ‘শিশুকামী’ বলে চিৎকার করে।
আমেরিকায় উপাসনালয়ে প্রবেশের সময় ধর্মপ্রাণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে যদি পুলিশের প্রয়োজন হয়, তাহলে বিষয়টি প্রত্যেক আমেরিকানের জন্যই উদ্বেগজনক হওয়া উচিত।
এই প্রবণতা শুধু নিউইয়র্কেই সীমাবদ্ধ নয়। লস অ্যাঞ্জেলেসের উইলশায়ার বুলেভার্ড টেম্পলের বাইরে মুখোশধারী ইহুদিবিদ্বেষী বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে উপাসনালয়ে প্রবেশকারীদের উদ্দেশে ‘শিশুহত্যাকারী’ এবং ‘জায়নবাদী শূকর’ বলে চিৎকার করে। পরে জোরপূর্বক সিনাগগে প্রবেশের ঘটনায় মারধর ও সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগে দুই বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে ধর্মীয় উপাসনা করার মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিপজ্জনক হুমকির প্রতিফলন।
শুধু ২০২৫ সালেই অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ (এডিএল) যুক্তরাষ্ট্রের সিনাগগগুলোতে বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট কয়েক ডজন ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনা এবং প্রায় ৫৩০টি হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। আগের বছরের তুলনায় সামগ্রিক ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনা কমলেও শারীরিক হামলা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই সংকট শুধু ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। গত শরতে মিশিগানে একটি এলডিএস গির্জা অবরোধের পর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আর মে মাসে সান দিয়েগোর বৃহত্তম মসজিদে শিক্ষার্থী ও মুসল্লিদের রক্ষা করতে গিয়ে তিন ব্যক্তি নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে উপাসনালয়গুলো ক্রমেই শান্তি, প্রার্থনা ও সামাজিক সম্প্রীতির আশ্রয়স্থলের পরিবর্তে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটেই এডিএল দ্বিদলীয় ও কংগ্রেসের উভয় কক্ষের সমর্থনপুষ্ট ‘রাইট টু ওয়ারশিপ অ্যাক্ট’ প্রণয়নে কাজ করেছে। সম্প্রতি সিনেটর টেড ক্রুজ (রিপাবলিকান-টেক্সাস) ও এলিসা স্লটকিন (ডেমোক্র্যাট-মিশিগান) এবং প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য টম সুয়োজি (ডেমোক্র্যাট-নিউইয়র্ক) ও ব্র্যাড নট (রিপাবলিকান-নর্থ ক্যারোলাইনা) বিলটি কংগ্রেসে উত্থাপন করেছেন।
প্রস্তাবিত আইনে ধর্মীয় উপাসনালয়ের চারপাশে ১০০ ফুটের নিরাপদ প্রবেশ এলাকা বা ‘সেফ অ্যাকসেস জোন’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বিঘ্নিত করা কিংবা মানুষকে উপাসনালয়ে প্রবেশে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হবে।
মূলত ‘রাইট টু ওয়ারশিপ অ্যাক্ট’ আমেরিকার দুটি মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষার চেষ্টা করছে—ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বাক্স্বাধীনতা।
আইনটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী দ্বারা সুরক্ষিত মতপ্রকাশের অধিকার স্পষ্টভাবে সংরক্ষণ করবে। একই সঙ্গে এমন আচরণের ক্ষেত্রে একটি সীমারেখা নির্ধারণ করবে, যা মানুষকে উপাসনালয়ে প্রবেশে বাধা দেয় কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ব্যাহত করে।
এই নতুন আইন প্রয়োজন বলে লেখকের যুক্তি। কারণ বর্তমান ফেডারেল আইন এমন কিছু অহিংস কর্মকাণ্ডকে যথেষ্টভাবে মোকাবিলা করতে পারে না, যেগুলোর উদ্দেশ্য উপাসনাকারীদের ভয় দেখানো, তাদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা কিংবা প্রথম সংশোধনীর অধীনে ধর্মীয় উপাসনার অধিকার প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা।
‘রাইট টু ওয়ারশিপ অ্যাক্ট’ অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে ইতোমধ্যে শুরু হওয়া উদ্যোগগুলোকেও আরও এগিয়ে নেবে। বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে এডিএল নিউ ইয়র্ক, মেরিল্যান্ড ও অ্যারিজোনায় নিরাপদ উপাসনা অঞ্চল-সংক্রান্ত আইন পাসের প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছে।
মার্চে নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলও এমন ‘বাফার জোন’ আইন ভেটো অতিক্রম করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করেছে। ক্যালিফোর্নিয়া ও পেনসিলভানিয়ায় অনুরূপ প্রস্তাবিত আইনের পক্ষেও প্রচার চলছে এবং আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতারা একই ধরনের ব্যবস্থা এগিয়ে নিচ্ছেন।
জনমতও এই ধরনের সুরক্ষার পক্ষে রয়েছে। নিউ ইয়র্কের নিবন্ধিত ভোটারদের ৭০ শতাংশ উপাসনালয়ের বাইরে বাফার জোন প্রতিষ্ঠার পক্ষে। এই সমর্থন দলীয় বিভাজনও অতিক্রম করেছে—ডেমোক্র্যাটদের ৭৩ শতাংশ, রিপাবলিকানদের ৭৩ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র ভোটারদের ৬৩ শতাংশ এ ধরনের ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন।
ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যেও সমর্থন শক্তিশালী। জরিপ অনুযায়ী, ৮৩ শতাংশ ইহুদি, ৭৬ শতাংশ মুসলিম এবং ৭২ শতাংশ খ্রিস্টান উপাসনালয়ের চারপাশে বাফার জোন সুরক্ষার পক্ষে।
এই বিস্তৃত আন্তধর্মীয় ও দ্বিদলীয় সমর্থন একটি মৌলিক সত্যকেই তুলে ধরে—ভয়ভীতি ছাড়া ধর্মীয় উপাসনা করার অধিকার শুধু ইহুদি, খ্রিস্টান কিংবা মুসলিমদের বিষয় নয়; এটি প্রত্যেক আমেরিকানের অধিকার।
এখন কংগ্রেসের সামনে প্রশ্নটি খুবই সরল: মানুষ যখন শুধু নিজ নিজ উপাসনালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করবে, তখন কি তাদের ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে দেওয়া হবে? নাকি আমেরিকান গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হবে?
এখন ফেডারেল পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু ফেডারেল আইনই দেশব্যাপী সমন্বিত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। ‘রাইট টু ওয়ারশিপ অ্যাক্ট’ বিদ্যমান আইনের ঘাটতি পূরণ করে প্রত্যেক মানুষের সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে ধর্মীয় উপাসনা করার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই প্রস্তাব করা হয়েছে।
ছাবেদ সাথী যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বাংলা প্রেস-এর সম্পাদক।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী ২৩ আগস্ট : উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথিকৃত শফিকুল গানি স্বপন
সঙ্গীত একাডেমি