১৫ আগস্ট ২০২৬

আমেরিকানদের মধ্যে কেন বাড়ছে পারস্পরিক ঘৃণা

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৩ পিএম
আমেরিকানদের মধ্যে কেন বাড়ছে পারস্পরিক ঘৃণা

আমেরিকানদের মধ্যে কেন বাড়ছে পারস্পরিক ঘৃণা

ছাবেদ সাথী

মার্কেট ল স্কুল পোলের গবেষকেরা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মানুষের পারস্পরিক আস্থায় প্রজন্মভিত্তিক তীব্র পতনের চিত্র তুলে ধরেছেন। ১৯৬০ সালের আগে জন্ম নেওয়া আমেরিকানদের মধ্যে এখনো একটি মৌলিক বিশ্বাস কাজ করে—সুযোগ পেলেই তাদের প্রতিবেশী তাদের সর্বস্ব লুটে নেবে না। দেশটির বিভিন্ন বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তারাই অন্যদের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থাশীল।

কিন্তু পরবর্তী প্রতিটি প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই চিত্র ক্রমেই খারাপ হয়েছে। ২০০০-এর দশকে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের মধ্যে গবেষণাটিতে এ পর্যন্ত রেকর্ড করা সর্বোচ্চ মাত্রার অবিশ্বাস দেখা গেছে। তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এমন এক মানসিকতা নিয়ে জীবনযাপন করছেন, যেখানে অন্য মানুষকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

এরপর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। চলতি বছরের শুরুতে পিউ রিসার্চ সেন্টার প্রকাশিত ২৫টি দেশের ওপর পরিচালিত একটি বিস্তৃত জরিপে দেখা যায়, আমেরিকানরা শুধু একে অপরকে অবিশ্বাসই করছেন না; ক্রমবর্ধমানভাবে তারা নিজ দেশের নাগরিকদের নৈতিকভাবেও অধঃপতিত বলে মনে করছেন। জরিপে অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য দেশের নাগরিকদের তুলনায় আমেরিকানদের মধ্যে নিজ দেশের মানুষকে মৌলিকভাবে নৈতিকতাবিবর্জিত হিসেবে দেখার প্রবণতা অনেক বেশি।

বিশেষভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক স্পষ্টভাবে বলেছেন, গড়পড়তা আমেরিকানের নৈতিকতা ও নীতিবোধ খারাপ। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সমাজ তখনই সংকটে পড়ে, যখন অধিকাংশ মানুষ আর বিশ্বাস করেন না যে তাদের সহনাগরিকেরা মৌলিকভাবে ভালো ও শালীন।

নৈতিকতা হচ্ছে সেই মৌলিক ও অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যা মানুষকে মুদি দোকানের পার্কিংয়ের মতো সামান্য বিষয় নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখে। এটি সামাজিক আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়ম নির্ধারণ করে। যখন একটি জনগোষ্ঠী এই অভিন্ন নৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন পুরো সামাজিক চুক্তিই এক ধরনের জিম্মি পরিস্থিতিতে পরিণত হয়।

বিরোধী রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে ‘ভুল’ মনে করলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিতর্কের সুযোগ থাকে। কিন্তু তাদের যদি সংশোধনের অযোগ্য বা সম্পূর্ণ নৈতিকতাবর্জিত বলে মনে করা হয়, তাহলে সমঝোতার ভিত্তি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাই শেষ হয়ে যায়। মানুষ যাকে ‘দানব’ মনে করে, তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় না; বরং সে আপনাকে ধ্বংস করার আগেই আপনি তাকে ধ্বংস করতে চান।

ক্ষোভ থেকে গভীর অবজ্ঞায়

এই নৈতিক আতঙ্ক এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে একে অপরের প্রতি চরম অবজ্ঞা ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত এসকেলেটর দিয়ে নেমে এসে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর সময় থেকে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির প্রধান আবেগ ক্ষোভ থেকে ধীরে ধীরে গভীর ও কাঠামোগত বিতৃষ্ণায় রূপ নিয়েছে।

সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জন গটম্যান কয়েক দশক ধরে দাম্পত্য সম্পর্ক কেন ভেঙে যায়, তা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী পূর্বাভাসগুলোর একটি হিসেবে ‘অবজ্ঞা’ বা contempt-কে চিহ্নিত করেছেন। গটম্যানের ব্যাখ্যায়, অবজ্ঞা হলো শত্রুতা ও উপহাসের এক বিষাক্ত সংমিশ্রণ, যেখানে একজন ব্যক্তি নিজেকে অন্যজনের তুলনায় নৈতিকভাবে উচ্চতর অবস্থানে রাখেন। তার গবেষণা অনুযায়ী, যখন কোনো দম্পতির যোগাযোগ চোখ ঘোরানো, বিদ্রূপ ও উপহাসের মাধ্যমে পরিচালিত হতে শুরু করে, তখন সেই সম্পর্ক কার্যত ধ্বংসের পথে চলে যায়।

একটি জাতিও মূলত অসংখ্য মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। এক অর্থে এটি লাখ লাখ মানুষের এক বিশাল সংসার—যেখানে কেউ একে অপরকে বেছে নেয়নি, কিন্তু সবাইকে একই বাড়িতে বসবাস করতে হচ্ছে।

বর্তমানে আমেরিকার সেই ‘দাম্পত্য সম্পর্ক’ যেন গটম্যানের বর্ণিত বিপর্যয়ের একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অংশীদারেরা আলাদা ঘরে ঘুমাচ্ছেন, পরস্পরের দিকে অপমান ছুড়ে দিচ্ছেন এবং মনে মনে চাইছেন প্রতিপক্ষের কোনো না কোনোভাবে পতন ঘটুক।

বিভাজন এখন লাভজনক ব্যবসা

এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কার প্রধান কারণ হলো—বর্তমান ব্যবস্থায় শত্রুতা ও বিদ্বেষের সঙ্গে আর্থিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের এক ধরনের সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

মিডিয়ার অ্যালগরিদম, রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো মানুষের এই অবজ্ঞা ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিপুল অর্থ আয় করে। শান্তিপূর্ণ ও পারস্পরিক আস্থাশীল জনগোষ্ঠী বর্তমান এই অবকাঠামোর জন্য অর্থনৈতিকভাবে ততটা লাভজনক নয়। আধুনিক আমেরিকা যেন পাশের মানুষটিকেই ‘শত্রু’ হিসেবে তুলে ধরার ওপর একটি ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলেছে। অর্থের প্রবাহ সচল রাখতে মানুষকে এতটাই ক্ষুব্ধ রাখতে হয়, যেন তারা ক্লিক করে, অনুদান দেয় এবং প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করতে থাকে।

প্রাতিষ্ঠানিক অভিজাতরা বুঝে গেছেন, ঐক্যের তুলনায় ক্ষোভকে অনেক সহজে এবং বৃহৎ পরিসরে কাজে লাগানো যায়। বিভক্ত জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে অনুমানযোগ্য ভোটব্যাংক ও নির্দিষ্ট ভোক্তাগোষ্ঠী তৈরি করে। এই পরিকল্পিত বিভাজন ক্ষোভনির্ভর শিল্পকে অর্থায়ন ও টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।

প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক প্রচারণায় এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয় যে বিরোধী পক্ষ ক্ষমতায় এলে সভ্যতাই ধ্বংস হয়ে যাবে—কেউ বলছে দেশকে কমিউনিজমের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে, আবার কেউ বলছে ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। বাস্তবে, কোনোটিই আকর্ষণীয় ভবিষ্যতের ছবি নয়।

নতুন প্রজন্মের সামনে কেমন আমেরিকা?

বর্তমানে যে প্রজন্ম প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশ করছে, তারা এমন একটি সমাজ খুব একটা দেখেনি যেখানে সহযোগিতা ছিল স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ। বরং তারা বড় হয়েছে এমন এক পরিবেশ দেখে, যেখানে বয়স্করা বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

তাই মার্কেটের গবেষণার তথ্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা ভুল হবে। বরং এটি আগামী ৩০ বছরের একটি পূর্বাভাস হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

দেশটি এমন এক চক্রে আটকে যাচ্ছে, যেখানে অবিশ্বাস জন্ম দেয় অবজ্ঞার; অবজ্ঞা সম্পর্ক ধ্বংস করে; আর সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্পর্ক পরবর্তী প্রজন্মকে আরও বেশি বিদ্বেষ ও অবজ্ঞার দিকে ঠেলে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র যেন ধীরে ধীরে পারস্পরিক ঘৃণার একটি স্থায়ী এবং অত্যন্ত লাভজনক অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবতার তুলনায় নামেই হয়তো বেশি ‘ঐক্যবদ্ধ’ ছিল। কিন্তু এখন দেশটি শুধু রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক বিভাজনেই বিভক্ত নয়; বরং এমন এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা অতিক্রম করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

ছাবেদ সাথী যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বাংলা প্রেস-এর সম্পাদক।

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

 

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আমরা ভবিষ্যতে কেমন বাংলাদেশ সোসাইটি দেখতে চাই!


আমরা ভবিষ্যতে কেমন বাংলাদেশ সোসাইটি দেখতে চাই!

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি