ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাবে ৩০ লাখ গৃহসেবাকর্মীর মজুরি সুরক্ষা প্রত্যাহারের আশঙ্কা
প্রবীণদের বাড়িতে সেবা
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্রে প্রবীণদের দেখভাল করা ব্যয়বহুল অনেক পরিবারের পক্ষেই এই খরচ বহন করা কঠিন। এ অবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসন সমস্যার সমাধান হিসেবে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের বাড়িতে সেবা দেওয়া ৩০ লাখের বেশি কর্মীর মজুরি সুরক্ষা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তর ওবামা আমলের একটি নিয়ম বাতিলের প্রস্তাব করেছে, যার মাধ্যমে গৃহভিত্তিক সেবাকর্মীদের ফেয়ার লেবার স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্ট (এফএলএসএ)-এর আওতায় আনা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ওই নিয়মের ফলে ১৯৩৮ সাল থেকে যেসব শ্রমিক ভোগ করে আসছিলেন—এমন মৌলিক শ্রম অধিকার গৃহপরিচর্যাকারীরাও পান।
এই অধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘণ্টায় অন্তত ৭.২৫ ডলার ফেডারেল ন্যূনতম মজুরি এবং সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে দেড় গুণ হারে ওভারটাইম মজুরি। সে সময় শ্রম দপ্তর জানিয়েছিল, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে 'ন্যায্য কাজের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই নিয়ম প্রত্যাশিত সুফল আনতে পারেনি, বরং এতে নিয়োগকর্তা, কর্মী এবং সেবাগ্রহীতা পরিবার সবারই ক্ষতি হয়েছে।
শ্রমিক অধিকারকর্মীরা পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন মজুরি সুরক্ষা তুলে নিলে এমন একটি শিল্প থেকে আরও বেশি কর্মী সরে যাবেন, যেখানে বার্ষিক কর্মী ছাঁটাই বা পরিবর্তনের হার ইতিমধ্যেই প্রায় ৮০ শতাংশ।
শিল্পগোষ্ঠীর দাবি: নিয়মটি অনিচ্ছাকৃত সমস্যার সৃষ্টি করেছে
দেশজুড়ে ৪,৩০০টি গৃহপরিচর্যা সংস্থার প্রতিনিধিত্বকারী হোম কেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা ২০১৩ সালের নিয়মের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। এতে বাস্তবায়ন কিছুটা বিলম্বিত হলেও শেষ পর্যন্ত নিয়ম কার্যকর হওয়া ঠেকানো যায়নি।
২০১৫ সালের শেষ দিকে নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর শিল্পগোষ্ঠীর দাবি, কর্মীদের আয় কমে যায়। পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি খরচ চাপাতে না চেয়ে সংস্থাগুলো ওভারটাইম না দিয়ে কর্মঘণ্টা ৪০ ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে যেসব সেবাকর্মী আগে একটি পরিবারে সপ্তাহে ৬০–৭০ ঘণ্টা কাজ করতেন, তারা আয়ের ঘাটতি পূরণে একাধিক সংস্থায় কাজ নিতে বাধ্য হন যার ফলে পরিবারগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ভেঙে যায়।
এদিকে নতুন কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও ধরে রাখতে সংস্থাগুলোর সময় ও ব্যয় বেড়েছে বলেও দাবি শিল্পগোষ্ঠীর।
তবে সেবাকর্মী অধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, শিল্পটিতে ওভারটাইম কখনোই খুব সাধারণ ছিল না। পিএইচআই নামের একটি গবেষণা ও অধিকার সংগঠনের মতে, ওবামা আমলের নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে মাত্র ১০ শতাংশ সেবাকর্মী সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতেন।
স্বল্প মজুরির এক শিল্প
১৯৩৮ সালে কংগ্রেস যখন এফএলএসএ পাস করে, তখন গৃহকর্মীদের আইনটির আওতার বাইরে রাখা হয় দক্ষিণের ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন নিশ্চিত করতে। ১৯৭৪ সালে কিছু গৃহকর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ‘শিশু দেখভালকারী’ ও ‘সঙ্গদাতা সেবা’ প্রদানকারীদের বাদ রাখা হয়।
ওবামা প্রশাসনের শ্রম দপ্তরের অবস্থান ছিল পেশাদার সেবাকর্মীদের কাজ কেবল সঙ্গ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পূর্ণাঙ্গ ও কঠিন শ্রম।
ন্যাশনাল ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্সের নীতি ও অধিকার বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হেয়ুং ইউন বলেন, 'এটি প্রকৃত কাজ, কিন্তু এখনও একে প্রকৃত কাজ হিসেবে দেখা হয় না।'
নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী ৬৩ বছর বয়সী সেবাকর্মী মারিলিন ব্ল্যাকেট জানান, তাঁর কাজ কেবল সঙ্গ দেওয়া নয়। প্রবীণদের খাওয়ানো, গোসল করানো, টয়লেটে সহায়তা, ক্ষত চিকিৎসা এমনকি কখনো কখনো হসপিস সেবাও দিতে হয়। নিউ ইয়র্ক শহরে ঘণ্টায় ২০ ডলারের কম মজুরি দিয়ে সংসার চালানো কঠিন বলে জানান তিনি।
ব্ল্যাকেট বলেন, ভাড়া দাও, বিল দাও, খাবার কিনো শেষে কিছুই হাতে থাকে না।
২০২৪ সালে গৃহভিত্তিক সেবাকর্মীদের জাতীয় মধ্যম মজুরি ছিল ঘণ্টায় ১৬.৭৮ ডলার, জানিয়েছে শ্রম দপ্তর। পিএইচআই-এর হিসাব অনুযায়ী, সেবাকর্মীদের প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনো ধরনের সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
হোম কেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার আইনবিষয়ক পরিচালক চেরিল স্ট্যানটন বলেন, 'সবাই একমত যে সেবাকর্মীরা আমাদের প্রবীণদের জন্য অমূল্য কাজ করছেন। আমরা সবাই চাই তাঁরা বেশি বেতন পান।' তবে তাঁর মতে, প্রধান সমস্যা হলো অর্থের সংকট। অনেক পরিবার নিজেরাই খরচ বহন করে এবং মেডিকেইড সব রাজ্যে গৃহভিত্তিক সেবা কভার করে না।
১৫৮ মিলিয়ন ডলার বকেয়া মজুরি
পিএইচআই-এর কেজিয়া স্কেলস বলেন, সেবাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ওবামা আমলের নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাগুলো প্রায় ১৫৮ মিলিয়ন ডলার বকেয়া মজুরি পরিশোধ করেছে।
পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ আমান্ডা ক্রাইডার বলেন, কর্মীর ঘাটতির সময় শ্রম সুরক্ষা কমানো যুক্তিসঙ্গত নয়।
'যখন শ্রমিকের সংকট রয়েছে, তখন কাজের মান খারাপ করে সেবার পরিধি বাড়ানো যায় না।'
নিউ ইয়র্কে রাজ্যের নিজস্ব ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স বিল অব রাইটস থাকায় সেখানকার সেবাকর্মীরা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছেন। তবুও মারিলিন ব্ল্যাকেট বলেন, 'এটি একটি পেশা। আমাদের কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি