আইসিইর হেফাজতে থাকা ৫ বছরের শিশু ও তার বাবাকে দ্রুত মুক্তির নির্দেশ বিচারকের
লিয়াম কোনেহো রামোস
আবু সাবেত: মিনেসোটার উপশহর মিনিয়াপোলিসে নিজ বাড়ির ড্রাইভওয়ে থেকে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে আটক হওয়া পাঁচ বছরের এক শিশু ও তার বাবাকে দ্রুত মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন একজন ফেডারেল বিচারক। আটক হওয়ার পর তাদের টেক্সাসের একটি অভিবাসন আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল।
শনিবার দেওয়া রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের জেলা বিচারক ফ্রেড বায়েরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গণ-বহিষ্কার নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি এই নীতিকে দৈনিক বহিষ্কার কোটা পূরণের জন্য পরিকল্পনাহীন ও অদক্ষভাবে বাস্তবায়িত সরকারি তৎপরতা বলে আখ্যা দেন, যা কার্যত শিশুদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার ওপর নির্ভরশীল বলে মন্তব্য করেন।
গত সপ্তাহে পাঁচ বছর বয়সী লিয়াম কোনেহো রামোস–কে তার পরিবারের বাড়ির ড্রাইভওয়ে থেকে ফেডারেল হেফাজতে নেওয়া হয়, যখন তার বাবা আদ্রিয়ান আলেকজান্ডার কোনেহো আরিয়াস–কে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় প্রার্থী। বাবা ও ছেলেকে টেক্সাসের একটি আইসিই আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়। পরিবারের সদস্য ও এই সপ্তাহে তাদের দেখতে যাওয়া আইনপ্রণেতাদের মতে, সেখানে শিশুটি অসুস্থ, অবসন্ন এবং বারবার তার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করছে।
রায়ে বিচারক প্রশাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সম্পর্কে 'অজ্ঞতা' এবং থমাস জেফারসনের “নবীন রাষ্ট্রের ওপর সম্ভাব্য স্বৈরশাসকের” সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার অভিযোগ তোলেন।
তিন পৃষ্ঠার রায়ে তিনি এখন ভাইরাল হয়ে যাওয়া একটি ছবিও সংযুক্ত করেন যেখানে দেখা যায়, তুষারাচ্ছন্ন ড্রাইভওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা লিয়াম, কাঁধে স্পাইডার-ম্যানের ব্যাকপ্যাক ও মাথায় নীল টুপি। এই ছবি প্রেসিডেন্টের অভিবাসনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিচারক তাঁর স্বাক্ষরের নিচে বাইবেলের দুটি পদও উল্লেখ করেন ম্যাথিউ ১৯:১৪ এবং জন ১১:৩৫।
ম্যাথিউর পদে বলা হয়েছে, 'যিশু বললেন, ছোট শিশুদের আমার কাছে আসতে দাও, তাদের বাধা দিও না; কারণ স্বর্গরাজ্য এদেরই।' আর জন ১১:৩৫–এ লেখা আছে, 'যিশু কেঁদেছিলেন।'
বিচারক বায়েরি ফেডারেল সরকারকে এক ধরনের 'নাগরিক শিক্ষা' ও দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী উদ্ধৃত করে বলেন, নির্বাহী বিভাগ নিজেই নিজের জন্য যে ‘প্রশাসনিক ওয়ারেন্ট’ জারি করে, তা সম্ভাব্য কারণের আইনি মানদণ্ড পূরণ করে না।
তিনি লেখেন, এটা যেন শিয়ালকে মুরগির খাঁচা পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া।' সংবিধান একটি স্বাধীন বিচারিক কর্তৃপক্ষের উপস্থিতি চায়।
এই সাংবিধানিক সুরক্ষাই শিশু ও তার বাবাকে আটক রাখার সরকারি সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে বলে রায়ে উল্লেখ করেন বিচারক।
তিনি আরও লেখেন, 'মানব আচরণ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতার লালসা ও সেই ক্ষমতা অর্জনের পথে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনের প্রবণতার কোনো সীমা নেই যেখানে মানবিকতা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আর সেখানে আইনের শাসন উপেক্ষিত হয়।
বিচারক বলেন, জটিল অভিবাসন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পরিবারটি শেষ পর্যন্ত তাদের জন্মভূমি ইকুয়েডরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে 'সেই সিদ্ধান্তটি বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ও মানবিক নীতির মাধ্যমে হওয়া উচিত।'
রায়ে তিনি ১৭৮৭ সালের সাংবিধানিক কনভেনশনের পর বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের বিখ্যাত উক্তিও স্মরণ করিয়ে দেন: 'একটি প্রজাতন্ত্র যদি তোমরা তা রক্ষা করতে পারো।'
লিয়ামের ছবি ও বাইবেলের দুটি পদের নিচে স্বাক্ষর দিয়ে বিচারক লেখেন, তিনি যেন 'সংবিধানের ফাটলে বিচারিক আঙুল চেপে ধরেছেন।
মিনিয়াপোলিসে চলমান গণগ্রেপ্তারের প্রতীক হয়ে উঠেছে লিয়ামের এই ছবি। শহরটি এখন ট্রাম্পের গণ-বহিষ্কার অভিযানের সর্বশেষ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা দেশজুড়ে একাধিক মামলা ও প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে।
রাজ্যের ফেডারেল আদালতগুলো এখন অভিবাসী ও নাগরিক উভয়ের পক্ষ থেকেই বেআইনি গ্রেপ্তার ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে ভরে উঠেছে।
লিয়াম ও তার বাবাকে আটকের কয়েক দিন পর মিনিয়াপোলিস কর্মকর্তারা জানান, দুই বছর বয়সী এক কন্যাশিশু ও তার বাবাকেও ফেডারেল হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মুদি দোকান থেকে ফেরার পথে অভিবাসন কর্মকর্তারা ওই ব্যক্তির গাড়ির কাচ ভেঙে তাদের গ্রেপ্তার করেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মিনিয়াপোলিস এলাকায় অন্তত পাঁচ শিশুকে ফেডারেল এজেন্টরা আটক করেছে লিয়াম ও ক্লো তাদের মধ্যে অন্যতম।
এই দৃশ্যগুলো দেশের অন্যান্য অংশে পরিচালিত অভিবাসন অভিযানের সঙ্গেও মিল রয়েছে, যেখানে স্কুল কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসকেরা ক্যাম্পাস ও বাড়িতে কর্মকর্তাদের হানার আশঙ্কায় আতঙ্কিত।
আইসিই কর্মকর্তা মার্কোস চার্লস গত সপ্তাহে বলেন, ২০ জানুয়ারির অভিযানে কর্মকর্তারা লিয়ামের বাবাকেই লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন। প্রতিবেশী ও স্কুল কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, ফেডারেল এজেন্টরা শিশুটিকে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন মাকে দরজা খুলতে বাধ্য করতে তাকে দরজায় কড়া নাড়তে বলা হয়েছিল। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এই অভিযোগকে 'সম্পূর্ণ মিথ্যা' বলে অস্বীকার করেছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, লিয়ামের বাবা পায়ে হেঁটে পালানোর চেষ্টা করেন এবং শিশুটিকে ড্রাইভওয়েতে থাকা একটি গাড়িতে রেখে যান।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মতে, কর্মকর্তারা 'বাবার ইচ্ছানুযায়ী শিশুটিকে তার সঙ্গেই রাখতে সম্মত হন।'
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ লিয়ামের বাবাকে 'অবৈধ অভিবাসী' হিসেবে আখ্যা দিলেও পরিবারের আইনজীবী মার্ক প্রোকশ চলতি মাসে সাংবাদিকদের জানান, পরিবারটি 'আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে এবং বৈধ পথেই অভিবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে।'
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি