১৯ আগস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার দৌড়ে আবদুল এল-সায়েদ, কে এই তরুণ রাজনীতিবিদ?

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৭ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার দৌড়ে আবদুল এল-সায়েদ, কে এই তরুণ রাজনীতিবিদ?

আবদুল এল সাইদ।

বাংলাপ্রেস ডেস্ক: আমার কাজিনদের মতো আমারও মিশরে ট্যাক্সি ক্যাব ড্রাইভার হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ইতিহাসের দুর্ঘটনায় আমার বাবা (যুক্তরাষ্ট্রের) ডেট্রয়েটে অভিবাসী হয়ে আসেন আর আমি আমেরিকান হিসেবে পরিচিতি পাই।

আগস্টের শুরুতে মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়ন নিশ্চিত করার পর বিজয় ভাষণে সমর্থকদের সামনে এভাবেই নিজের পরিবারের অতীতের গল্প তুলে ধরেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে হঠাৎই আলোচনার জন্ম দেওয়া আবদুল এল সাইদ। তাকে নিয়ে আলোচনা যে শুধু তার মিশরীয় অভিবাসী বাবা-মার সন্তান বা মুসলিম রাজনীতিবিদ হওয়ার কারণে, তা নয়।

সাবেক এই জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার, ইসরাইলবিরোধী অবস্থান এবং বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীতে আমেরিকান অর্থায়ন বন্ধের দাবি তাকে মিশিগানের ডেমোক্র্যাট মনোনয়ন প্রত্যাশী করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তার নির্বাচনি প্রচারের মূল বক্তব্য ছিল, মানি আউট অব পলিটিক্স, মানি ইন ইওর পকেট, হেলথকেয়ার ফর অল - অর্থাৎ রাজনীতি থেকে অর্থকে সরিয়ে তা মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা। 

একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা করে তিনি এমন ভোটারদের আকৃষ্ট করেছেন, যারা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ ।

পাশাপাশি ইসরাইলসহ যে কোনো দেশের সেনাবাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের বিরোধিতাও তাকে তার সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় করেছে। ইসরাইলের সেনাবাহিনীকে অর্থ সহায়তা দেওয়াকে 'আমাদের ট্যাক্স ডলারের নিকৃষ্টতম ব্যবহার' বলে সমালোচনা করেছেন তিনি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, মিশিগান রাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে তিনি নিজের দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সমর্থনই পাননি। যে কারণে তাকে বলা হচ্ছে 'আউটসাইডার', বা বহিরাগত।

বামপন্থি মতাদর্শের অনুসারী এল সাইদকে নির্বাচনে সমর্থন দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বার্নি স্যান্ডার্স, আলেক্সান্দ্রা ওসারিও-কর্টেজের মতো বামপন্থী ভাবধারার অনুসারী নেতারা।

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মিডটার্ম নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সেনেটর পদের জন্য রিপাবলিকান পার্টির মাইক রজার্সের, যিনি ট্রাম্পের কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত, সঙ্গে লড়াই করবেন আবদুল এল সাইদ।

আর ঐ নির্বাচনে জিতলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম সেনেটর।

যেভাবে রাজনীতিতে উঠে আসা

একচল্লিশ বছর বয়সি এল সাইদকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বহিরাগত বলা হলেও মূলধারার রাজনীতিতে তার প্রথম সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায় ২০১৮ সালে, মিশিগান রাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের সময়।

সেসময় তিনি গভর্নর নির্বাচনে হেরে গেলেও মোট ভোটের ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ঐ নির্বাচনেও তার মূল এজেন্ডা ছিল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং রাজনীতি থেকে পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন বাদ দেয়া।

তবে ধারণা করা হয় এল সাইদের রাজনীতিতে আসার প্রাথমিক অনুপ্রেরণাটা তৈরি হয়েছিল ২০০৭ সালে, যখন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়।

সে বছর এপ্রিলে মিশিগান ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বিল ক্লিনটনের উপস্থিতিতে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে বক্তব্য রেখেছিলেন আবদুল এল সাইদ। তার ঐ বক্তব্যের পর বিল ক্লিনটন নিজের ভাষণের সময় অতিথিদের সামনেই তার বক্তব্যের প্রশংসা করেন।

পরে মি. ক্লিনটন তার সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করেও তার প্রশংসা করেছিলেন।

সেই ঘটনার দশ বছর পর, ২০১৭ সালে, আবদুল এল সাইদ ঘোষণা দেন যে তিনি মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে লড়বেন। ঐ নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরের পাবলিক হেলথ বিভাগের পরিচালকের চাকরি ছাড়েন।

৩০ বছর বয়সে, ২০১৫ সালে, এল সাইদ যখন ডেট্রয়েটের পাবলিক হেলথ বিভাগের পরিচালক হন তখন তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় শহরে এমন পদে থাকা সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি। দায়িত্বে থাকার সময় তিনি শিশু মৃত্যুহার কমানো, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে চশমা প্রদান ও শতাধিক স্কুলে সীসার মাত্রা পরীক্ষা করার মতো জনপ্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছেন।

সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম কমিউনিটিরও ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিলেন এল সাইদ।

এ বছরের এপ্রিলে মিশিগানের প্রাথমিক নির্বাচনের জন্য প্রার্থিতা ঘোষণার পর তিনি আবার আলোচনায় আসেন।

এবারের নির্বাচনের প্রচারণায় নিজেকে এল সাইদ তুলে ধরেছেন কর্পোরেশনগুলোর মুখোমুখি হতে চাওয়া একজন শ্রমজীবী নেতা হিসেবে, যিনি ইসরাইলপন্থী অর্থায়নকারী আর দলীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী নেতাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

আর তার এমন অবস্থানের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সমালোচনা করেছেন 'ইহুদি বিদ্বেষী' হিসেবে।  আবদুল এল সাইদ মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট মনোনয়ন জেতার পর ট্রাম্প বলেন, এই ব্যক্তি (এল সাইদ) ইহুদিদের ভালোবাসে না, সে ইসরাইলকে ভালোবাসে না, সে তাদের ঘৃণা করে।  এল সাইদ অবশ্য বিভিন্ন সময়ে এই সামলোচনার জবাব দিয়েছেন।

তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছে তার নির্বাচনি এলাকার ইহুদিদের নিয়ে তার মতামত কী, তিনি বারবারই এমন উত্তর দিয়েছেন যে তাদের তিনি ঠিক ততোটই নিরাপত্তা দিতে চান যতোটা 'নিরাপত্তা তিনি তার দুই মেয়ের জন্য' দিতে চান।

যেভাবে আলোচনায় এলেন

বিশ্লেষকদের মতে, মিশিগান রাজ্যের প্রাথমিক নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়ন জেতার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে ইসরাইল ইস্যুতে দুই প্রার্থীর প্রস্তাবিত নীতির পার্থক্য।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং ইসরাইলকে অর্থায়নের বিপক্ষে সোচ্চার ছিলেন এল সাইদ। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ক নিয়ে তার অবস্থানের জন্য মিশিগানের ইহুদি সম্প্রদায়ের একাংশ যেমন তাকে সমর্থন দিয়েছে, আরেকটি অংশ তার বিরোধিতাও করেছে।

অন্যদিকে তার বিরোধী প্রার্থী হেইলি স্টিভেন্সের নির্বাচনের অর্থায়নের বড় অংশ এসেছে ইসরাইলপন্থী আমেরিকান সরকারি একটি সংস্থা আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি, আইপ্যাক। মিজ স্টিভেন্স নিজেও এই মতবাদে বিশ্বাসী যে ইসরাইলকে কোনো শর্ত ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা করে যাওয়া উচিৎ।

ইসরাইলসহ বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীকে অর্থায়ন করার নীতি সম্পর্কে এল সাইদ বলেন, ইসরাইল, মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তান, জর্ডান, আরব আমিরাত, কাতার যে কোনো দেশের সেনাবাহিনীতে অর্থায়ন করার বিপক্ষে আমি। আমি এই চিন্তা করে ট্যাক্স দেই না যে কাতার আমার টাকা দিয়ে ট্যাঙ্ক তৈরি করবে, বরং আমি এই চিন্তা করে ট্যাক্স দেই যে, যদি ঐ টাকা দিয়ে রাস্তা বানাতো বা স্কুল সংস্কার করতো তাহলে ভালো হত।

এছাড়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেও এল সাইদ ভোটারদের নজর কেড়েছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে। তাদের মতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছর যেসব ভোটার ট্রাম্প প্রশাসন নিয়ে অসন্তুষ্ট, তাদের অনেকেই এল সাইদকে সমর্থন দিয়েছেন।

এক সাক্ষাৎকারে এল সাইদ মন্তব্য করেন যে, আমরা মাইক রজার্স আর 'ট্রাম্পবাদ'কে হারাতে একতাবদ্ধ। সামনের বছরগুলোতে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাই ও এমন একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে চাই যিনি গণতন্ত্রের মূলনীতিতে বিশ্বাস করেন, মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চান।

নির্বাচনের আগে প্রচারণার সময় তিনি এক সময় বলেছিলেন, আপনি যদি একজন সেনেটর চান যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি হবেন, তাহলে সেই ক্যান্ডিডেট আপনার সামনেই আছে।

তবে আবদুল এল সাইদের বিজয় নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়ায় ভূমিকা রাখবে।

নভেম্বরে মিডটার্ম নির্বাচনে তার জয় পাওয়া আমেরিকায় ডেমোক্র্যাটদের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২৪ এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেয়া মিশিগান রাজ্য সেক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের কাছে চলে আসবে, যা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তাদের জন্য বড় সুবিধা করে দেবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

আর মিশিগান অঙ্গরাজ্যে এল সাইদ জয় পেলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্যও ডেমোক্র্যাটরা হয়তো মধ্যমপন্থী নেতাদের বাদ দিয়ে বামপন্থী চিন্তাধারার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার বিষয়ে চিন্তা করবে।
বিপি>টিডি
 

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

আমরা ভবিষ্যতে কেমন বাংলাদেশ সোসাইটি দেখতে চাই!


আমরা ভবিষ্যতে কেমন বাংলাদেশ সোসাইটি দেখতে চাই!

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি