আইসিসির প্রেসিডেন্ট-আইনজীবীসহ ১১ জনের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
তোমোকো আকানে।
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট এবং একজন সিনিয়র আইনজীবীর ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
এটি ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষোভের সবশেষ বহিঃপ্রকাশ, যার লক্ষ্য হলো যুদ্ধাপরাধ তদন্তের ক্ষমতাসম্পন্ন এই আদালতটি 'ভেঙে দেওয়া'। বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশ আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ তদন্তের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত এই আদালতের সদস্য।
মার্কো রুবিও বলেন, আইসিসি প্রেসিডেন্ট জাপানের তোমোকো আকানে এবং আইসিসির সিনিয়র আইনজীবী সেনেগালের আবদুলায়ে সেয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে।
তার অভিযোগ, তারা এমন সরকারি কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টায় যুক্ত ছিলেন, যাদের সরকার আইসিসির এখতিয়ার মেনে নেয়নি।
আইসিসি বলছে তারা তাদের কর্মীদের পাশে আছে এবং তাদের বিশ্বাস রুবিও যা ঘোষণা করেছেন তা এমন পদক্ষেপ যা আইনের শাসনকে দুর্বল করবে।
মার্কো রুবিও আইসিসিকে ‘একটি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং মারাত্মকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন আদালত' হিসেবে অভিহিত করেন।
তার অভিযোগ, আদালত ইচ্ছাকৃতভাবে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং নিজস্ব এখতিয়ার অতিক্রম করেছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ আমরা সহ্য করব না।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বা হোয়াইট হাউস এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে আইসিসির অন্তত ১১ জন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ৯ জন বিচারক এবং প্রধান প্রসিকিউটর।
এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে সম্পদ জব্দ করা, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন সেবা পাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ।
আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা ও কর্মকর্তাদের নিয়ে আইসিসির তদন্ত এবং গাজায় সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ইসরাইলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার প্রতিশোধ হিসেবেই এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে।
নেতানিয়াহু যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং আদালতকে ইহুদিবিদ্বেষ দ্বারা প্রভাবিত বলে অভিযোগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল- কেউই আইসিসিরর সদস্য নয়।
তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ২০১৫ সালে আইসিসির সদস্য হয়, যার ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা অপরাধগুলোর তদন্তের পথ আদালতের জন্য উন্মুক্ত হয়।
আইসিসির প্রতি ট্রাম্পের বিরোধিতা তার প্রথম মেয়াদ থেকেই চলে আসছে। সে সময় তিনি প্রথমবার আইসিসিকে একটি 'হুমকি' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই আদালতের 'কোনো এখতিয়ার, বৈধতা বা কর্তৃত্ব নেই'।
গত মাসে রুবিও আইসিসির ১২৫টি সদস্য দেশকে আদালটি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি ছিল মার্কিন সরকারের আইসিসিকে বিলুপ্ত করে দেওয়ার প্রচারণার অংশ।
ক্রমবর্ধমান চাপের এই প্রচারণার মধ্যে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটন আগ্রহের সঙ্গে দেখবে যে কারা তাদের আহ্বানে সাড়া দেয় এবং কারা দেয় না।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আইসিসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার করার আন্তর্জাতিক এখতিয়ার রয়েছে।
কোনো বিষয় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো হলেও এই আদালত সেটিরও তদন্ত ও বিচার করতে পারে।
মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে আইসিসি বলেছে, রাষ্ট্রগুলো যে দায়িত্ব আইসিসিকে দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে কাজ করা বিচারক, প্রসিকিউটর ও কর্মীদের লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপ আইনের শাসনকে দুর্বল করে। বিচারিক কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগ করার কারণে যখন হুমকির মুখে পড়েন, তখন ঝুঁকির মুখে পড়ে খোদ আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থাই।
অধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের এমন কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছে, যেগুলোকে তারা আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন সরকারের দায়মুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেষ্টাকেই দমন করার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।
গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আন্তর্জাতিক বিচার বিষয়ক পরিচালক লিজ এভেনসন বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যাকে খুশি তাকে আইনের শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে চাইছে।
চারটি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করার পর তিনি এই মন্তব্য করেছেন। সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, আইসিসিকে ভেঙে দিতে প্রশাসনের যে প্রচেষ্টা তা অসাংবিধানিক।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউট, আমেরিকান ফ্রেন্ডস সার্ভিস কমিটি এবং সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটস নিউইয়র্কে দায়ের করা মামলায় বলেছে, নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইসিসির সঙ্গে কাজ করতে পারছে না।
জুন মাসে আইসিসির তিন বিচারকও নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। গত বছর তাদের ওপর আরোপ করা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে করা এই মামলায় তারা দাবি করেন, এসব নিষেধাজ্ঞা আইনবহির্ভূত। কানাডার বিচারক কিম্বারলি প্রস্ট, উগান্ডার সোলোমন বালুঙ্গি বোসা এবং বেনিনের রেইন আলাপিনি-গানসু বলেন, নিষেধাজ্ঞাগুলো বিচারকদের ওপর বিচারবহির্ভূত চাপ সৃষ্টি, শাস্তি দেওয়া এবং তাদের দিয়ে নির্দিষ্ট কাজ করিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে।
সে সময় হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্ট (আইইইপিএ)-এর অধীনে তার ক্ষমতা আইনসম্মতভাবেই প্রয়োগ করেছেন।
নিষেধাজ্ঞা থাকলে সেটি একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন পরিচালনার সক্ষমতাকেও মারাত্মকভাবে সীমিত করে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন ব্যাংকগুলো কিংবা মার্কিন ডলারে লেনদেন পরিচালনাকারী ব্যাংকগুলোও এসব নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে বাধ্য হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর তার প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
জুলাই মাসে আইসিসিকে ভেঙে দেওয়ার প্রচারণা ঘোষণা করে দেওয়া এক ভিডিও বিবৃতিতে মার্কো রুবিও অভিযোগ করেন যে, আইসিসি আইন, চুক্তি এবং তথাকথিত আন্তর্জাতিক আইনের শক্তি ব্যবহার করে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আজ তারা প্রতিটি দিক থেকেই আমাদের রাজনৈতিক ও আইনি ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। তারা যদি মনে করে যে তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিতে পারবে, তাহলে আমরা তাদের আমেরিকার দৃঢ় সংকল্পের পূর্ণ অর্থ বুঝিয়ে দেব। সূত্র: যুগান্তর
বিপি>টিডি
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার দৌড়ে আবদুল এল-সায়েদ, কে এই তরুণ রাজনীতিবিদ?
আমিরাতে ফের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আমিরাত প্রেসিডেন্টের ফোনালাপ
আমরা ভবিষ্যতে কেমন বাংলাদেশ সোসাইটি দেখতে চাই!
সঙ্গীত একাডেমি