যুক্তরাষ্ট্রে বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেটে আসছে বিশাল উত্থান
ছাবেদ সাথী
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাতের দিন খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। দীর্ঘদিনের কম নির্মাণ, নির্মাণ খরচের বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট ও উচ্চ সুদের কারণে বাড়ির দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যার ফলে নতুন প্রকল্প ও আবাসিক বিক্রয় উভয়ই মন্থর হয়ে পড়েছে।
কিন্তু এই অবস্থা কি চিরকাল থাকবে? না। আর যখন পরিস্থিতি বদলাবে, তখন আমি এমন এক অভূতপূর্ব উত্থানের ভবিষ্যদ্বাণী করছি, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরস ও ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব হোমবিল্ডারস-এর তথ্যানুযায়ী, রিয়েল এস্টেট খাত যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখে। অর্থাৎ, আসন্ন উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব ফেলবে। বিক্রেতা, নির্মাতা, ঠিকাদার, আইনজীবী, হিসাবরক্ষক, ব্রোকার, বিমা কোম্পানি, খুচরা বিক্রেতা এবং অসংখ্য ছোট ও মাঝারি ব্যবসা এই উত্থানের সুফল পাবে।
তাহলে কী ঘটতে হবে? প্রথমত, মর্টগেজের সুদের হার কমতে হবে সম্ভবত ৫.৫ শতাংশের নিচে।
হ্যাঁ, এখনও অনেকেই ২ শতাংশ সুদের মর্টগেজ ধরে রেখেছেন এবং বর্তমান হারে নতুন ঋণ নেওয়ার কথা ভাবলে কুঁকড়ে যান। কিন্তু সংখ্যা তত বেশি নয়। ফেডারেল হাউজিং ফাইন্যান্সিং এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান মর্টগেজের প্রায় ২২ শতাংশের হার ৩ শতাংশের নিচে, এবং প্রায় ১৪.৩ শতাংশের হার ৬ শতাংশ বা তার বেশি। অর্থাৎ, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মর্টগেজ ধারকের সুদহার ৩ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে এরাই সুদের হার কমলে আবার বাজারে ফিরবেন।
এই ক্রেতাদের জন্য মর্টগেজের হার ৫.৫ শতাংশের নিচে নামলে নতুন বাড়ি কেনা আর অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। বর্তমানে ৩০ বছরের মর্টগেজে ৬.২ শতাংশ হারে তারা বছরের শুরুতে ৭ শতাংশ হারের তুলনায় প্রায় মাসে ২০০ ডলার সাশ্রয় করছেন। প্রবণতাটি ইতিবাচক। যদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বন্ড মার্কেটের ফলন (যা মর্টগেজ হার নির্ধারণ করে) আরও কিছুটা কমে, তাহলে আগামী ১২ মাসের মধ্যেই এটি বাস্তবে ঘটতে পারে।
বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেটে, ফেডারেল রিজার্ভের সাম্প্রতিক সুদ কমানোর ফলে বর্তমানে প্রাইম রেট ৭.২৫ শতাংশে নেমেছে; আরও এক শতাংশ কমলে অনেক বিনিয়োগকারী বাজারে ফিরবেন।
একই সঙ্গে নতুন কারখানা নির্মাণে কর ছাড়ের আইন বাজারে গতি আনবে। আগেই যেমন বলা হয়েছে, ট্যারিফ (শুল্কনীতি)-এর কারণে অনেক উৎপাদক যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসছে—এটি কয়েক বছর সময় নেবে, তবে বাণিজ্যিক সম্পত্তির চাহিদা বাড়াবে। স্টক মার্কেটের দামও স্থিতিশীল বা বাড়তে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার এখনও সর্বকালের সর্বোচ্চের কাছাকাছি, ফলে গৃহস্থালি সম্পদও উচ্চ পর্যায়ে। স্টক মার্কেট দেশের সম্পদ, আত্মবিশ্বাস ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এর পতন রিয়েল এস্টেট খাতের জন্য বড় ধাক্কা হবে।
যদিও মূল অর্থনৈতিক সূচকগুলো জিডিপি, কর্মসংস্থান, পুঁজি প্রাপ্যতা—এখনও ভালো অবস্থায় আছে, তবুও ক্রিপ্টো মার্কেট ধস বা AI-বুমের ভেতরে বুদবুদ ফাটার আশঙ্কা একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি। যদি এমন কিছু না ঘটে, তাহলে শক্তিশালী স্টক ও বন্ড মার্কেট সম্ভাব্য ক্রেতাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং সুদের হার কমলে তারা বাজারে ফিরবেন।
তৃতীয়ত, আয় বৃদ্ধির হারকে মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি থাকতে হবে। এডিপি পেরোল কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ৩২,০০০ চাকরি হারিয়েছে। এটি অবশ্যই ভালো খবর নয়, তবে একই সঙ্গে এডিপি জানিয়েছে তাদের পেরোল সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী চাকরিতে থাকা কর্মীদের বেতন বেড়েছে ৪.৫ শতাংশ, আর চাকরি পরিবর্তনকারীদের ৬.৬ শতাংশ।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ২.৯ শতাংশ, অর্থাৎ বেতনবৃদ্ধি তার চেয়ে অনেক বেশি। অনেক তরুণ এখনও বাড়ি না কিনে ভাড়ায় থাকছেন, যা উচ্চ সুদের সময়ে যৌক্তিক। তবে আয় যদি মূল্যস্ফীতির চেয়ে এগিয়ে থাকে এবং সুদের হার ধীরে ধীরে কমে, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অনেকেই ভাড়াটিয়া থেকে মালিক হয়ে উঠবেন।
চতুর্থত, বুমার প্রজন্মের সম্পদ হস্তান্তর চলতে থাকবে। ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের সংখ্যা ২০৪০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে ৭৮.৩ মিলিয়ন, আর ২০৬০ সালে ৮৮.৮ মিলিয়নে পৌঁছাবে।
ফরচুন ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আমেরিকা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে পরবর্তী ২৫ বছরে প্রায় ১২৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ প্রজন্মান্তরে হস্তান্তর হবে।
সেরুলি অ্যাসোসিয়েটস নামের বোস্টনের এক ধন-পরিচালনা প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হস্তান্তরের বড় অংশই হবে বেবি বুমার ও প্রবীণ আমেরিকানদের সম্পদ তাদের উত্তরাধিকারী, বিধবা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর।
ফেডারেল এস্টেট ট্যাক্স ও গিফট ট্যাক্স ছাড়ের সীমা স্থায়ীভাবে বাড়ায় অনেক বুমার ও জেন এক্স প্রজন্ম এখনই ট্রাস্ট ও আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে সম্পদ হস্তান্তর শুরু করেছেন। আর যখন তারা প্রয়াত হবেন (আমি নিজেও তাদের একজন), আরও বিপুল সম্পদ তাদের উত্তরসূরিদের হাতে আসবে যা তরুণ প্রজন্মকে বাড়ি কেনায় বড় সহায়তা দেবে। সবকিছুই এক একটি চক্রের অংশ।
গত কয়েক বছর রিয়েল এস্টেট খাত নিম্নগামী ছিল। কিন্তু সেটি বদলাবে এটাই বাস্তবতা। আর যখন সেই পরিবর্তন আসবে, তখন এই খাত এক অভূতপূর্ব উত্থান দেখবে।
এটি কখন ঘটবে? কেউ জানে না। কিন্তু খুব শিগগিরই যদি ওপরের বিষয়গুলো অনুকূলে থাকে। তাই যদি আপনি রিয়েল এস্টেট বা সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যবসায় থাকেন স্থির থাকুন, নগদ সংরক্ষণ করুন, আর বৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত থাকুন।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি