৪ মে ২০২৬

বিনা ওয়ারেন্টে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া আপনার তথ্য কিনছে সরকার

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম
বিনা ওয়ারেন্টে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া আপনার তথ্য কিনছে সরকার

ওয়েব ব্রাউজার থেকে বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রি

ছাবেদ সাথী
সেলফোন অ্যাপ ও ওয়েব ব্রাউজার থেকে বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করে এমন একটি বড় শিল্পখাত গড়ে উঠেছে যাদের বলা হয় ‘ডেটা ব্রোকার’। এসব তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করা হয়, যাতে তারা লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ডেটা বিশেষ করে মোবাইল ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য পুলিশ বিভাগ ও ফেডারেল সংস্থাগুলোর কাছেও বিক্রি হচ্ছে, যা কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই আমেরিকানদের ব্যক্তিগত জীবনের অন্তরঙ্গ তথ্য প্রকাশ করতে পারে।
গোপনীয়তা রক্ষাকারী সংগঠনগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর (Fourth Amendment) একটি পরিচিত ফাঁক বন্ধ করার সুযোগ খুব শিগগিরই আসছে। কংগ্রেস শিগগিরই ‘ফরেন ইন্টেলিজেন্স সারভেইলেন্স অ্যাক্ট’ (এফআইএসএ)-এর ৭০২ ধারা পুনর্নবীকরণ নিয়ে আলোচনা করবে, যার মেয়াদ ২০ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা।

Taja Bhabna


২০১৫ সালে আইনে পরিবর্তনের পর ফেডারেল সংস্থাগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের তথ্য ব্যাপকভাবে সংগ্রহ করার কথা নয়। তবে অনেক সংস্থা ওয়ারেন্ট নেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি ডেটা কিনে নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।
গত সপ্তাহে প্রায় ১৩০টি নাগরিক সমাজ সংগঠন কংগ্রেস সদস্যদের উদ্দেশে একটি চিঠিতে এই ডেটা ব্রোকার ফাঁক বন্ধ করার আহ্বান জানায়। তারা সতর্ক করে বলেছে, “ওয়ারেন্ট ছাড়া ব্যাপক নজরদারির নজিরবিহীন বিস্তার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যকে গ্রাস করছে” এবং এই ফাঁকটি 'এআই-নির্ভর নজরদারিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।'
গত সপ্তাহে সিনেটের এক শুনানিতে সিনেটর রন ওয়াইডেন এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি আমেরিকানদের মোবাইল লোকেশন ডেটা কেনা থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দেবেন। প্যাটেল তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এফবিআই 'সব ধরনের উপায় ব্যবহার করে' এবং 'আইনসম্মত ও সংবিধানসম্মতভাবে বাণিজ্যিকভাবে উপলব্ধ তথ্য কিনে থাকে,' যা তাদের জন্য মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য এনে দিয়েছে।
এফবিআই ঠিক কোন ধরনের ডেটা কিনছে, সে বিষয়ে সংস্থাটি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। ২০২৩ সালে তৎকালীন এফবিআই পরিচালক ক্রিস্টোফার রে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সংস্থাটি ইন্টারনেট বিজ্ঞাপনভিত্তিক লোকেশন ডেটা ব্যবহারে কিছুটা পিছিয়ে এসেছে।
ডেটা ব্রোকারদের কাছ থেকে পাওয়া লোকেশন তথ্য সাধারণত ব্যবহারকারীর নামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এমন প্রযুক্তি রয়েছে যা একটি ডিভাইস কোথায় যায়, কোথায় রাত কাটায় এবং কোথায় কাজের সময় যায় এসব বিশদভাবে ট্র্যাক করতে পারে বলে জানান ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বিল বুডিংটন।
এআই নজরদারিকে আরও শক্তিশালী করছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এই ডেটাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই সম্প্রতি সতর্ক করে বলেন, সরকার যে ধরনের তথ্য কিনতে পারে, তা ব্যবহার করে এআই “স্বয়ংক্রিয়ভাবে এবং বিশাল পরিসরে যেকোনো ব্যক্তির জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করতে পারে।”
তিনি আরও জানান, দেশীয় ব্যাপক নজরদারি বা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পেন্টাগনের সঙ্গে তাদের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
নজরদারি বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার
এফবিআই ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)-এরও ডেটা ব্রোকার থেকে সংগৃহীত লোকেশন তথ্যভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের চুক্তি রয়েছে। অভিবাসন নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি এখন তারা ফেডারেল এজেন্টদের কার্যক্রম ধারণকারী ব্যক্তি ও প্রতিবাদকারীদের ওপরও নজরদারি করছে ফেসিয়াল রিকগনিশন, লাইসেন্স প্লেট ডেটা এবং প্রযুক্তি কোম্পানির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে।
এ বছর আইসিই একটি ফেডারেল ক্রয়সাইটে 'কমার্শিয়াল বিগ ডেটা ও অ্যাড-টেক' ব্যবহারের বিষয়ে মতামত চেয়েছে, যা তাদের তদন্তে কাজে লাগতে পারে।
গত বছর আইসিই ‘পেনলিংক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে, যার ‘ওয়েবলক’ প্রোগ্রাম ব্যবহার করে মোবাইল ফোনের গতিবিধি ট্র্যাক করা বা নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়া ফোন শনাক্ত করা সম্ভব।
পেনলিংকের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা ডেটা গোপনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখে এবং হাসপাতাল, স্কুল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল স্থানগুলোকে তাদের ডেটা থেকে বাদ দেয়।
তবে এই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে আইসিই কোনো মন্তব্য করেনি।
ইলেকট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ আইন উপদেষ্টা জেরামি ডি. স্কট বলেন, 'ওয়ারেন্ট ছাড়া সরকারের ডেটা কেনা এমন এক নজরদারি অবকাঠামো তৈরি করছে, যা আমাদের একটি ডিস্টোপিয়ান নজরদারি সমাজের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।'
গণহারে ডেটা সংগ্রহ বন্ধের ‘এ বছর একমাত্র সুযোগ’ এফআইএসএ বিল: গোপনীয়তা কর্মীদের দাবি
গোপনীয়তা ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, আসন্ন ফরেন ইন্টেলিজেন্স সারভেইলেন্স অ্যাক্ট (এফআইএসএ) পুনর্নবীকরণ বিতর্কই এ বছর কংগ্রেসের সামনে এমন একমাত্র সুযোগ, যার মাধ্যমে ফেডারেল সংস্থাগুলো যে 'ডেটা ব্রোকার ফাঁক' ব্যবহার করে ব্যাপক তথ্য কিনছে, তা বন্ধ করা যেতে পারে।
অধিকারভিত্তিক সংগঠন ডিমান্ড প্রগ্রেসের নির্বাহী পরিচালক শন ভিটকা বলেন, 'এ বছর কংগ্রেসের কাছে অর্থবহ গোপনীয়তা সুরক্ষার পক্ষে ভোট দেওয়ার সম্ভবত এটিই একমাত্র সুযোগ।” তিনি সতর্ক করে বলেন, সংস্কার না হলে সাম্প্রতিক এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি, ডেটা ব্রোকারের বিস্তার এবং ২০২৪ সালের আইনি পরিবর্তনের কারণে 'ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক নজরদারি ক্ষমতা' চলে এসেছে।
ওহাইওর রিপাবলিকান প্রতিনিধি ওয়ারেন ডেভিডসন এবং উটাহর সিনেটর মাইক লি ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জোয়ে লফগ্রেন ও সিনেটর রন ওয়াইডেনের সঙ্গে যৌথভাবে একটি দ্বিদলীয় এফআইএসএ সংস্কার বিল উত্থাপন করেছেন, যার লক্ষ্য ডেটা ব্রোকার ফাঁকসহ একাধিক দুর্বলতা বন্ধ করা।
ডেভিডসন বলেন, 'এটি এমন একটি বিষয় যা দলীয় বিভাজনের মধ্যে পড়ে না।' তিনি ব্যাখ্যা করেন, সরকার যখন ডেটা ব্রোকারদের কাছ থেকে তথ্য কেনে, তখন তারা এমন তথ্য সংগ্রহ করে, যার জন্য স্বাভাবিকভাবে কখনোই ওয়ারেন্ট পাওয়া যেত না।
তিনি আরও একটি ফাঁক ‘ব্যাকডোর সার্চ’ বন্ধ করার আহ্বান জানান, যেখানে বিদেশি যোগাযোগের সঙ্গে সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে থাকা মার্কিন নাগরিকদের ডেটা ওয়ারেন্ট ছাড়াই অনুসন্ধান করা হয়।
তবে এফআইএসএ পুনর্নবীকরণের সঙ্গে এই সংস্কারগুলো যুক্ত করার বিষয়টি দুই দলেরই কিছু সদস্যের বিরোধিতার মুখে পড়েছে। হোয়াইট হাউস ও হাউস স্পিকার মাইক জনসন কোনো পরিবর্তন ছাড়াই আইনটি নবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কিছু ডেমোক্র্যাটও আইনটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে একই অবস্থানকে সমর্থন করছেন।
নিজ দলের ভেতরেও বিরোধিতা থাকায় জনসন এই বিষয়ে হাউস ভোট এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থগিত করেছেন।
ডেটা ব্রোকারদের কাছ থেকে সরকারের গণহারে তথ্য কেনার বিষয়টি এখনো আদালতে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়নি, ফলে এটি একটি আইনি ধূসর এলাকায় রয়েছে। গোপনীয়তা কর্মীরা বলছেন, এই পদ্ধতি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীকে পাশ কাটায় এবং ২০১৫ সালের ইউএসএ ফ্রিডম অ্যাক্টের চেতনাবিরোধী, যা ফেডারেল সংস্থাগুলোকে নাগরিকদের গণহারে তথ্য সংগ্রহ থেকে বিরত রাখে।
সেন্টার ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড টেকনোলজির নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রকল্পের উপপরিচালক জেক লাপেরুক বলেন, 'কংগ্রেস যখন গণহারে ডেটা সংগ্রহ নিষিদ্ধ করেছে, তখন এর অর্থ ছিল একেবারেই না করা। করদাতার অর্থ দিয়ে সেটি কিনে নেওয়া নয়।'
তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালের সুপ্রিম কোর্টের ‘কার্পেন্টার বনাম ইউনাইটেড স্টেটস’ মামলার রায়ে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির মোবাইল লোকেশন ডেটা পেতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওয়ারেন্ট প্রয়োজন। সেই প্রেক্ষাপটে ডেটা ব্রোকারদের কাছ থেকে একই তথ্য কেনা যৌক্তিক নয়, বিশেষ করে যখন তথাকথিত ‘অ্যানোনিমাইজড’ ডেটা থেকেও ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব।
লাপেরুক উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'আমরা কখনোই কল্পনা করব না যে পুলিশ বলবে ‘আমাদের ওয়ারেন্ট নেই, কিন্তু আমরা আপনার বাড়িওয়ালাকে ১০০ ডলার দিয়ে চাবি কিনেছি, তাই আমরা আপনার বাড়িতে ঢুকছি।’
ডেভিডসন বলেন, ডেটা ব্রোকাররা শনাক্তযোগ্য তথ্য বিক্রি করতে পারছে এটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিস্তৃত গোপনীয়তা আইন প্রয়োজন। তিনি বলেন,
'ততদিন পর্যন্ত সরকার অর্থ দিয়ে চতুর্থ সংশোধনীকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে—এটি বন্ধ করতে হবে। 
তিনি আরও যোগ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে, কারণ এটি মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল পরিমাণ ডেটা ও এআই প্রযুক্তির সমন্বয় নজরদারির নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে—যার প্রভাব হতে পারে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি