১৮ জুন ২০২৬

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি: নৃশংসতা, বৈষম্য ও আমেরিকান আদর্শের পতন

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৪২ পিএম
ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি: নৃশংসতা, বৈষম্য ও আমেরিকান আদর্শের পতন
    ছাবেদ সাথী ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের সঙ্গে যে নির্মম, বৈষম্যমূলক ও মানবাধিকারের পরিপন্থী আচরণ হচ্ছে-তা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং আমেরিকার সংবিধান ও মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত। নির্বিচারে আটক, আইনজীবী বঞ্চিত বিচার, শিশু-কিশোরদের সঙ্গে নিষ্ঠুরতা এবং মুখোশধারী এজেন্টের সহিংসতা দেশকে এক বিপজ্জনক পথে নিয়ে যাচ্ছে। এই নীতি একদিকে যেমন রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, অন্যদিকে তা আমেরিকার নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মে মাসে, মার্সেলো গোমেজ নামে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ যিনি ৭ বছর বয়স থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন একটি মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসা নিয়ে — ম্যাসাচুসেটসের মিলফোর্ডে একটি ভলিবল খেলায় যাওয়ার পথে গ্রেফতার হন। আটকাবস্থায় ছয় দিন তিনি একই পোশাক পরেছিলেন, কংক্রিট মেঝেতে ঘুমিয়েছেন এবং ৩৫ থেকে ৪০ জন পুরুষের সঙ্গে একটি শৌচাগার ভাগ করে ব্যবহার করেছেন। জুন মাসে, ৪৮ বছর বয়সী নারসিসো বাররাঙ্কো যিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা আনায় মালী হিসেবে কাজ করছিলেন এবং যার কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না তাকে চারজন মুখোশধারী কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার পেট্রোল (সিবিপি) এজেন্ট রাস্তায় ফেলে বারবার মাথায় আঘাত করেন। পরবর্তীতে লস অ্যাঞ্জেলেসে মেক্সিকান কনসুলেটের আনুষ্ঠানিক অনুরোধে বাররাঙ্কো চিকিৎসা পান, কারণ তিনি আঘাত এবং হৃদ্‌রোগে ভুগছিলেন। তার তিন ছেলের একজন যারা সবাই মার্কিন মেরিন বাহিনীতে কাজ করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন যে বাররাঙ্কো অফিসারদের উপর আগাছা কাটার যন্ত্র নিয়ে হামলা করেছিলেন। তিনি বলেন, “আমি যদি ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় কাউকে এভাবে মারতাম, তা হলে সেটা যুদ্ধাপরাধ হতো।” একই সময়ে, সৈয়দ নাসের যিনি আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের পক্ষে অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছেন তার স্পেশাল ইমিগ্রান্ট ভিসার শুনানির পর আইসিই-এর হাতে গ্রেফতার হন এবং সান ডিয়েগোর একটি দ্রুতবিচার বন্দিশালায় পাঠানো হয়। তালেবানরা তার ভাইকে হত্যা এবং এক বিয়ের অনুষ্ঠানে তার বাবাকে অপহরণ করার পর তিনি ব্রাজিলে পালিয়ে যান, সেখান থেকে ৬,০০০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং শরণার্থীর মর্যাদায় প্রবেশের অনুমতি পান। মে মাসে, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম আফগানদের জন্য টেম্পোরারি প্রটেকটেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) বাতিল করেন, যার ফলে ১১,০০০ আফগান নাগরিক এখন দেশছাড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। যদি নাসের যার কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই তার ‘বিশ্বাসযোগ্য হুমকি’ সাক্ষাৎকারে (যেটি ফোনে হবে, কোনো আইনজীবীর উপস্থিতি ছাড়াই) উত্তীর্ণ না হন, তবে তাকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই ফেরত পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে তার স্ত্রী ও সন্তানরা আত্মগোপনে আছেন।     কয়েকদিন আগে, কিলমার আব্রেগো গার্সিয়া আদালতে এক হলফনামায় জানান, তাকে ভুল করে স্যালভাডরের বের খ্যাত দুর্বিষহ একটি কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়, যেখানে তিনি নির্যাতনের শিকার হন। এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে ট্রাম্প প্রশাসনের আটক ও নির্বাসন নীতি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী-সমাজ ভিত্তিক ঐতিহ্য, মূল্যবোধ এবং মানবিক ন্যায্যতার পরিপন্থী। বর্তমানে আটক ৫৯,০০০ অভিবাসীর মধ্যে ৭০ শতাংশকে ধরা হয়েছে সীমান্তে নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরেই। এর মধ্যে ৪৭ শতাংশের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই, আর যাদের আছে, তাদের অপরাধ মূলত ইমিগ্রেশন বা ট্রাফিক আইন ভঙ্গ। এখন পর্যন্ত আইসিই মাত্র ৬ শতাংশ অভিবাসী হত্যাকারী এবং ১১ শতাংশ যৌন নির্যাতনের দণ্ডপ্রাপ্ত অভিবাসীকে আটক করতে পেরেছে। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সম্ভবত এ ব্যাপারে অজ্ঞ যে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাস একটি অসামরিক (সিভিল) অপরাধ, অপরাধমূলক নয় সাংবাদিকদের বলেন, 'আইসি যাদেরই ধরে, তারা সবাই অপরাধী, কারণ তারা অবৈধভাবে আমাদের দেশের আইন ভেঙেছে।' অথচ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বৈধ ও অবৈধ অভিবাসীরা উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী নাগরিকদের তুলনায় অনেক কম হারে অপরাধ করে। টেক্সাসে, অবৈধ অভিবাসীদের দ্বারা অপরাধ সংঘটনের সম্ভাবনা স্থানীয়দের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কম। বন্দিশালাগুলিতে ভয়াবহ ভিড়, ওষুধ প্রাপ্যতার ঘাটতি, স্নান করার সুযোগ সপ্তাহে একবার এবং আত্মীয়দের অনুপস্থিতি এই অবস্থাগুলিই সাধারণ। ফ্লোরিডার 'আমেরিকানস ফর ইমিগ্রান্ট জাস্টিস' সংস্থার পরিচালক পল চাভেজ বলেন, 'আগেও পরিস্থিতি ভালো ছিল না, কিন্তু এখন এটা ভয়াবহ।' ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত আইসিই হেফাজতে ১০ অভিবাসী মারা গেছেন যার মধ্যে দুজন আত্মহত্যা করেছেন এবং এই সংখ্যা বাইডেন প্রশাসনের সময়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। সর্বশেষ দুই মৃত্যুর মধ্যে একজন হলেন ৭৫ বছর বয়সী কিউবান অভিবাসী ইসিড্রো পেরেজ, যিনি ৫৯ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন এবং ১৯৮৪ সালে একটি মাদক মামলায় দণ্ডিত হন। আইন অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতারের সময় নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে হয় এবং আইনি সীমার মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। কিন্তু, সরকারি কর্মকর্তারা কখন মুখোশ পরতে পারেন, তা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কর্মকর্তারা বলেন যে আইসিই এজেন্টদের নিরাপত্তার জন্য মুখোশ পরা প্রয়োজন। তবে সমালোচকরা বলছেন, মুখোশ ও সাধারণ পোশাক সন্দেহভাজনদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য দায়ী করা কঠিন করে তোলে। বস্টনের মেয়র মিশেল উ জিজ্ঞেস করেন, 'গোপন পুলিশ বলতে আর কী বোঝায়, যখন মুখোশধারী কেউ এসে রাস্তায় মানুষ ধরে নিয়ে যায়, তাদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে তা বলা হয় না, এবং তারা ‘অদৃশ্য’ হয়ে যায় যতক্ষণ না কেউ কোন তথ্য খুঁজে পায়?' যদিও আমেরিকানরা এখনো নিরাপদ সীমান্ত সমর্থন করে, সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ নাগরিক ট্রাম্পের অভিবাসন ও আইসিই কৌশলকে সমর্থন করেন না। সম্ভবত এই কারণেই ট্রাম্প অভিবাসন নিয়ে দ্বৈত অবস্থান নিচ্ছেন। ২০২৪ সালের প্রচারণায় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, 'প্রথমে সবচেয়ে বিপজ্জনকদের' গ্রেফতার করা হবে। গত মাসে ট্রাম্প বলেন, '২১ মিলিয়ন অবৈধ অভিবাসীসহ সবাইকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে, কারণ তারা আমাদের একটি দেউলিয়া তৃতীয় বিশ্বের দেশে পরিণত করবে।' অথচ তিনি আবার এও বলেন, অভিবাসন নীতির কারণে বহু দক্ষ ও পুরনো কর্মী কাজ হারাচ্ছেন, যাদের প্রতিস্থাপন প্রায় অসম্ভব। অপরাধীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দিতে হবে' এই অঙ্গীকারের মধ্যেই ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি খামার, মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় আইসিই অভিযানে সাময়িক বিরতি দিতে পারেন। কিন্তু ডিএইচএস-এর জনসংযোগ বিভাগের সহকারী সচিব ট্রিসিয়া ম্যাকলাফল দ্রুতই বলেন, 'প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন এমন কোনো শিল্প খাত নিরাপদ নয় যারা সহিংস অপরাধীদের আশ্রয় দেয় বা আইসিইE-এর কাজ ব্যাহত করে।' এই লেখাটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত ট্রাম্প এমন কোনো বিরতির ঘোষণা দেননি। এদিকে, আটক ও নির্বাসনের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি আইনি সহায়তা ও যথাযথ প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও। কংগ্রেসম্যান টনি গঞ্জালেজ (রিপাবলিকান–টেক্সাস) ও আরও পাঁচজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা প্রশাসনকে অনুরোধ করেছেন যেন তারা 'পরিষ্কার রেকর্ডধারী' অভিবাসীদের পরিবর্তে সন্ত্রাসী বা ড্রাগ কার্টেল সদস্যদের খুঁজতে বেশি সময় ব্যয় করে। প্রশ্ন উঠছে: জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কত নিচে নামলে বা কত বড়সংখ্যক নিয়োগদাতা চাপ দিলে প্রেসিডেন্ট বুঝতে পারবেন যে তার অভিবাসন নীতি শুধু ভুল রাজনীতি নয় বরং একেবারেই ভুল নীতি? ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক এবং মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক [বাংলা প্রেস বিশ্বব্যাপী মুক্তচিন্তার একটি সংবাদমাধ্যম। স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের জন্য নিরপেক্ষ খবর, বিশ্লেষণ এবং মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজ আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।] বিপি।এসএম
[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি