ফোবানার সুখ-দুঃখের পাশে ছাব্বিশ বছর
ফোবানার সুখ-দুঃখের পাশে ছাব্বিশ বছর
ছাবেদ সাথী
কিছু পথচলা ক্যালেন্ডারের পাতায় মাপা যায় না; সেগুলো মাপা হয় স্মৃতি, মানুষের ভালোবাসা আর সময়ের পরীক্ষায়। আমার কাছে ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা—ফোবানা—ঠিক তেমনই এক নাম। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচয়, সময়ের প্রবাহে সেই প্রতিষ্ঠানই হয়ে উঠেছে আমার সাংবাদিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
২০০০ সালে নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে প্রথম ফোবানা সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলাম একজন তরুণ সংবাদকর্মী হিসেবে। হাতে ছিল নোটবুক, কাঁধে ক্যামেরা আর মনে ছিল সীমাহীন কৌতূহল। কে জানত, সেই প্রথম পদচারণাই আমাকে টানা ছাব্বিশ বছরের এক দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গী করে তুলবে! এরপর একে একে কেটে গেছে বহু বছর। পাল্টেছে শহর, পাল্টেছে আয়োজক, পাল্টেছে নেতৃত্ব, পাল্টেছে সময়। কিন্তু ফোবানাকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবেগ বদলায়নি।
আগামী ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সাল সিটির হিলটন লস অ্যাঞ্জেলেস হোটেলে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফোবানার ৪০তম সম্মেলন। চল্লিশ বছর—একটি সংগঠনের জন্য এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও সাফল্যের এক দীর্ঘ মহাকাব্য।
এই দীর্ঘ পথচলায় আমি দেখেছি আনন্দের উল্লাস, আবার দেখেছি বিভেদের বেদনা। দেখেছি হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, আবার দেখেছি মতবিরোধের উত্তাপ। কখনো সম্মেলনের মঞ্চ করতালিতে মুখর হয়েছে, কখনো করিডোরে হয়েছে তর্ক-বিতর্ক। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার মধ্যেই ছিল একটি অভিন্ন পরিচয়—আমরা সবাই বাংলাদেশি, আমরা সবাই এই প্রবাসের সন্তান।
সাংবাদিক হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল ঘটনাকে যেমন দেখেছি, তেমনভাবেই পাঠকের সামনে তুলে ধরা। প্রশংসা যেমন লিখেছি, তেমনি প্রয়োজনে কঠিন প্রশ্নও করেছি। কারণ সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত ব্যক্তি নয়, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। অনেক সময় আমার লেখা কারও কাছে অস্বস্তির কারণ হয়েছে, আবার অনেকেই সেই লেখায় নিজের বক্তব্যের প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি, যুক্তি ও তথ্যভিত্তিক সমালোচনা কোনো সংগঠনের শত্রু নয়; বরং সেটিই তাকে আরও পরিণত ও শক্তিশালী করে।
কোভিড-১৯ মহামারি শুধু বিশ্বকে থামিয়ে দেয়নি; প্রবাসী সংগঠনগুলোকেও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। ফোবানাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। নেতৃত্ব, দিকনির্দেশনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। সেই সময় আমি নীরব দর্শক হয়ে থাকিনি। একজন সাংবাদিক হিসেবে যা দেখেছি, যা যাচাই করেছি এবং যা কমিউনিটির জন্য প্রয়োজনীয় মনে করেছি, তাই লিখেছি। আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, সেই কঠিন সময়ে কলম ছিল আমার একমাত্র শক্তি, আর সত্য ছিল আমার একমাত্র সাহস।
ছাব্বিশ বছরে আমি অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। অনেককে নেতৃত্বে আসতে দেখেছি, অনেককে বিদায় নিতে দেখেছি। কেউ আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাদের অবদান ফোবানার ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে। আবার নতুন প্রজন্মও এগিয়ে আসছে, নতুন চিন্তা নিয়ে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে। এটাই একটি জীবন্ত সংগঠনের সৌন্দর্য।
আমার কাছে ফোবানা মানে শুধু তিন দিনের সম্মেলন নয়। এটি মানে প্রবাসে বাংলা ভাষার উচ্চারণ, রবীন্দ্রসংগীতের সুর, নজরুলের চেতনা, স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা, মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা, বহুদিন পর প্রিয়জনের সঙ্গে আলিঙ্গন, আর হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলাদেশকে হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্ত প্রয়াস।
আজ যখন ফোবানা চল্লিশে পা রাখছে, তখন আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। মত থাকবে, মতভেদও থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু মতভেদ যেন বিভাজনে পরিণত না হয়। কারণ ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী, প্রতিষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী; আর কমিউনিটির স্বার্থ সবার ঊর্ধ্বে।
আমি এমন একটি ফোবানার স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি পাশাপাশি চলবে। যেখানে নারী নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হবে, তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে, প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে সংগঠন আরও আধুনিক হবে এবং উত্তর আমেরিকার প্রতিটি বাংলাদেশি নিজেকে এই প্ল্যাটফর্মের অংশ বলে গর্ব অনুভব করবেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের আসন্ন সম্মেলন সেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হোক। ভিন্নমত থাকুক, কিন্তু বিভেদ নয়; প্রতিযোগিতা থাকুক, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়; থাকুক কেবল সম্মান, সহযোগিতা এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।
ফোবানার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংবাদ সংগ্রহের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক আবেগের সম্পর্ক। সুখে-দুঃখে, সাফল্যে-সংকটে, প্রশংসায়-সমালোচনায় গত ছাব্বিশ বছর ধরে আমি এই সংগঠনের পথচলার একজন নীরব সাক্ষী। সেই সাক্ষ্যই আমাকে আশাবাদী করে যে, অতীতের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে ফোবানা আগামী চার দশকে আরও সমৃদ্ধ, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির গর্ব হয়ে উঠবে।
পেছনে ফিরে তাকালে দেখি, ছাব্বিশ বছর যেন চোখের পলকে কেটে গেছে। কিন্তু প্রতিটি সম্মেলন, প্রতিটি সংবাদ, প্রতিটি মানুষের মুখ আজও স্মৃতির পাতায় স্পষ্ট। সুখের দিন যেমন ছিল, তেমনি ছিল দুঃখের দিনও। আর সেই কারণেই আজও বলতে পারি—ফোবানার সুখ-দুঃখের পাশে গত ছাব্বিশ বছর ছিলাম, আছি, ভবিষ্যতেও থাকব।
কারণ ফোবানা শুধু একটি সংগঠন নয়—এটি উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের সম্মিলিত ইতিহাস, আত্মপরিচয় এবং আগামী দিনের স্বপ্ন।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
গ্যাস সংকট স্বাভাবিক করতে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন করুন - : সরকারকে বাংলাদেশ ন্যাপ
সঙ্গীত একাডেমি