তাঁর সঙ্গে কী কথা?
ছাবেদ সাথী
ফ্লোরিডার পাম বিচে অবস্থিত মার-এ-লাগো একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট, আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার এক নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাতেই সোমবার (২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫) অনুষ্ঠিত হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বহুল আলোচিত বৈঠক। প্রশ্ন উঠছে এই সাক্ষাতে কী কথা হলো, আর কেনই বা এই বৈঠক বিশ্বরাজনীতির নজর কেড়েছে?
ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে ক্ষমতার বাইরে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তিনি এখনো এক প্রভাবশালী চরিত্র। রিপাবলিকান রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা এই নেতার সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক নতুন নয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি, মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি সবই ছিল নেতানিয়াহু সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক অর্জন। সেই পুরোনো রাজনৈতিক রসায়নের পুনরুজ্জীবনই যেন এই মার-এ-লাগো বৈঠকের মূল সুর।
বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল-মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। গাজা যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, হিজবুল্লাহ ও হামাস ইস্যু সব মিলিয়ে নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক চাপের মুখে। অন্যদিকে ট্রাম্প আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নিজেকে আবারও বৈশ্বিক নেতৃত্বের বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী। এই বাস্তবতায় মার-এ-লাগোর বৈঠক নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না বরং এটি ছিল কৌশলগত বার্তা বিনিময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার কেন্দ্রে ছিল পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাহলো- হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে ট্রাম্পের কঠোর সময়সীমা, ইরানে হামলার হুমকি নতুন করে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমা-ট্রাম্পের দাবিতে হারজোগের অস্বীকার, সিরিয়া নিয়ে ‘বোঝাপড়া’র দাবি এবং রাশিয়ার পক্ষে সুর, চীনের মহড়া খাটো করে দেখা।
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও ইরান ইস্যু। ট্রাম্প বরাবরই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে, আর নেতানিয়াহু এই অবস্থানের অন্যতম জোরালো সমর্থক। দ্বিতীয়ত, গাজা যুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও কূটনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমর্থন। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী ভোটব্যাংক ও লবির ভূমিকা।
মার-এ-লাগোর এই বৈঠক আরেকটি বার্তাও দেয় ট্রাম্প এখনো বৈশ্বিক মিত্রদের কাছে ‘ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট’। ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি এমন বৈঠকের মাধ্যমে ইঙ্গিত দিচ্ছেন, ক্ষমতায় ফিরলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। নেতানিয়াহুর উপস্থিতি সেই ইঙ্গিতকে আরও স্পষ্ট করেছে।

সোমবার মার-এ-লাগোতে মধ্যাহ্নভোজের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রায় একই সুরে কথা বলেন। তারা হামাস-কে নিরস্ত্রীকরণের চাপ বাড়ান এবং ইরান যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি জোরদার করে, তবে আবারও হামলার হুঁশিয়ারি দেন।
ট্রাম্প বলেন, গাজা যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনায় ইসরায়েল '১০০ শতাংশ' প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে যদিও চলতি মাসের শুরুতে গাজায় হামাসের শীর্ষ এক সামরিক নেতাকে হত্যার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র নাকি নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিল।
তিনি আরও বলেন, হামাস দ্রুত নিরস্ত্রীকরণে রাজি না হলে তাদের 'সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস' করা হবে। এমনকি সেপ্টেম্বরের শান্তিচুক্তির শর্ত মানতে হামাস অস্বীকৃতি জানালে কিছু আরব দেশ সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে এমন ইঙ্গিতও দেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প জানান, ইরান আবার 'গড়ে তুলছে কি না' তা স্পষ্ট নয় ইঙ্গিত ছিল সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রতিবেদনের দিকে। তবে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র বি–২ বোমারু পাঠাতে পারে বলেও সতর্ক করেন যেমনটি জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সময় করা হয়েছিল।
এছাড়া তিনি ইউক্রেনে শান্তি প্রচেষ্টা, সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা আনার উদ্যোগ এবং তাইওয়ানের আশপাশে চীনের সামরিক মহড়া নিয়েও কথা বলেন। নিচে বৈঠকের পাঁচটি মূল দিক তুলে ধরা হলো—
১) হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে ট্রাম্পের কঠোর সময়সীমা
ট্রাম্প বলেন, হামাসকে 'খুব অল্প সময়ের' মধ্যেই অস্ত্র নামাতে হবে; নচেৎ তাদের 'মুছে ফেলা হবে।' যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ প্রায় শেষ—একজন (সম্ভবত মৃত) বাদে সব জিম্মি ইসরায়েলে ফিরেছে।
তবে দ্বিতীয় ধাপে যেতে হামাস নেতৃত্ব বা নেতানিয়াহুর সরকার—কেউই ট্রাম্পের মতো তাড়াহুড়ো দেখাচ্ছে না। এই ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার বড় অংশ থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার অন্তর্ভুক্ত।
ট্রাম্প বলেন, শান্তিচুক্তিতে সই করা “অন্যান্য দেশ” প্রয়োজনে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে সামরিক হস্তক্ষেপেও রাজি হতে পারে।
মর্টন ক্লেইন, জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন অব আমেরিকার সভাপতি, ট্রাম্পের 'স্বল্প সময়সীমা' ঘোষণাকে স্বাগত জানান। অন্যদিকে আনোয়ার মেজনে (স্টোনহিল কলেজ) বলেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হামাস পুনর্গঠিত হচ্ছে এবং তাদের নিরস্ত্রীকরণের 'স্পষ্ট পথ' নেই। একই সময়ে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার উদ্যোগ চলছে—যা পরবর্তী শাসন কাঠামোকে জটিল করে তুলছে।
২) ইরানে হামলার হুমকি নতুন করে
ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সম্ভাবনার কথা বলেন, বিশেষ করে তেহরান যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বাড়ায়।
বলেন তিনি, 'ওরা যদি আবার গড়ে তুলতে চায়, আমাদের খুব দ্রুত তা নিশ্চিহ্ন করা ছাড়া উপায় থাকবে না'
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধে রয়েছে।
জুনে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়ে সামরিক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা করে এবং অস্ত্র কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত করে। কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্র ইসফাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদো-তে বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ফেলে। পেন্টাগনের মতে, এতে ইরানের কর্মসূচি 'এক থেকে দুই বছর' পিছিয়েছে তবে মেজনে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এমন প্রমাণ নেই।
তবু ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতেও প্রস্তুত।
৩) নেতানিয়াহুকে ক্ষমা—ট্রাম্পের দাবিতে হারজোগের অস্বীকার
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট ইসহাক হারজোগ ট্রাম্পের সেই দাবি নাকচ করেন যে তিনি নাকি নেতানিয়াহুকে ক্ষমা করবেন বলে ট্রাম্পকে জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহু দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ঘুষের অভিযোগে ২০২০ থেকে চলমান বিচারের মুখোমুখি; তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ট্রাম্প অভিযোগগুলোকে 'হাস্যকর' বলে সমালোচনা করেছেন এবং অক্টোবরে ইসরায়েল সফরে হারজোগকে ক্ষমার অনুরোধও করেছিলেন।
হারজোগের দপ্তর জানায়, ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা হয়নি; তার এক সহকারীর সঙ্গে আলাপ হয়েছে এবং বিষয়টি প্রচলিত প্রক্রিয়াতেই বিবেচিত হবে। ক্লেইন অবশ্য মনে করেন, শেষ পর্যন্ত ক্ষমা আসতে পারে।
৪) সিরিয়া নিয়ে ‘বোঝাপড়া’র দাবি
ট্রাম্প বলেন, সিরিয়া নিয়ে তার ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি 'বোঝাপড়া' হয়েছে এবং তিনি নিশ্চিত যে ইসরায়েল ও সিরিয়ার নতুন নেতা আহমেদ আল-শারা পরস্পরের সঙ্গে মানিয়ে নেবেন।
নেতানিয়াহু আল-শারাকে অবিশ্বাস করেন কারণ তার অতীতে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। তবু ট্রাম্প বলেন, 'সিরিয়ায় শক্ত নেতা দরকার।' নেতানিয়াহু যোগ করেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য সিরিয়ার সঙ্গে শান্ত সীমান্ত এবং দ্রুজসহ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা।
৫) রাশিয়ার পক্ষে সুর, চীনের মহড়া খাটো করে দেখা
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেন নাকি পুতিনের বাসভবনে ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছে এ অভিযোগে তিনি 'খুব ক্ষুব্ধ',যদিও কিয়েভ তা অস্বীকার করেছে। তিনি বলেন, ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধে এখনো 'কয়েকটি জটিল বিষয়' বাকি।
তাইওয়ানের আশপাশে চীনের সামরিক মহড়া প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, চীন '২০–২৫ বছর ধরে' সেখানে নৌ-মহড়া চালাচ্ছে—এবারেরটা নতুন কিছু নয়।
তবে সমালোচকেরাও কম নন। তাদের মতে, এই বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের কূটনৈতিক অবস্থানকে পাশ কাটিয়ে এক ধরনের ছায়া-পররাষ্ট্রনীতির চর্চা। প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা একজন রাজনীতিকের সঙ্গে বিদেশি নেতার এমন ঘনিষ্ঠ আলোচনা কতটা নৈতিক ও গণতান্ত্রিক?
সব মিলিয়ে, ‘কী কথা তাহার সাথে?’এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। মার-এ-লাগোর দেয়ালের ভেতরে বলা কথাগুলো প্রকাশ্যে আসেনি ঠিকই, কিন্তু এই বৈঠক এটুকু স্পষ্ট করেছে যে বিশ্বরাজনীতির দাবার বোর্ডে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুজনেই নিজেদের পরবর্তী চালের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর সেই চালের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলেই নয়—ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে।
সারকথা: মার-এ-লাগো বৈঠকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু হামাস ও ইরান ইস্যুতে কড়া অবস্থান নিলেও, কূটনৈতিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি। একই সঙ্গে সিরিয়া, ইউক্রেন–রাশিয়া ও চীন–তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যে তার বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি