৪ মে ২০২৬

ছাবেদ সাথী'র কলাম

সততা ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি: পার্বতীপুরের সাংবাদিক আব্দুল কাদির

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:০৪ পিএম
সততা ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি: পার্বতীপুরের সাংবাদিক আব্দুল কাদির

ছাবেদ সাথী
আশির দশকে আমি যখন সাংবাদিকতা শুরু করি তখনও আব্দুল কাদির আমার সিনিয়র সাংবাদিক। দিনাজপুরের পার্বতীপুর। রেল নগরীর ব্যস্ততা, মানুষের সুখ–দুঃখ, স্থানীয় প্রশাসনের নানা টানাপোড়েন-এই সব কিছুর মাঝেই চার দশকের বেশি সময় ধরে কলমের আলোর মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন মানুষ। তিনি আব্দুল কাদির-মফস্বল সাংবাদিকতার এক নির্ভীক, সৎ ও দায়িত্বশীল মুখ। তাঁর হঠাৎ মৃত্যুর খবর পৌঁছায় আমেরিকার আরেক প্রান্তে থাকা সহকর্মী হিসেবে আমার কাছেও, এবং সেই খবর মুহূর্তেই যেন ছিন্নভিন্ন করে দেয় আমার হৃদয়।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকাল ৭টা। প্রতিদিনের মতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে আচমকাই থেমে যায় তাঁর জীবনযাত্রা। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পথেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৬৫। কুড়িগ্রামের উলিপুরে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি পার্বতীপুরকে ভালোবেসে আজীবন এখানকার মানুষের কথা লিখেছেন, তাঁদের অধিকার নিয়ে লড়েছেন।
মনে পড়ে সেই আশির দশকের সেই স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা। তখন সবেমাত্র আমি শিক্ষানবিশ সাংবাদিক। পার্বতীপুর শহীদ মিনারের উত্তর পাশের তাঁর সেই ব্রাদার্স লাইব্রেরিতে কারণে অকারণে যেতাম। তিনি যে শুধু সাংবাদিক ছিলেন তা নয়। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সকল পত্রিকার এজেন্ট ছিলেন তিনি। ঠিক দুপুরের পর প্রতিদিন পত্রিকা পড়তে যেতাম তার লাইব্রেরিতে। তখন পত্রিকার বান্ডিল আসত সৈয়দপুর বিমানবন্দরে, এরপর রিক্সাযোগে পোঁছাত পার্বতীপুরে। তখন আমি বগুড়ার করতোয়া ছাড়াও আজকের কাগজ, রুপালী ও ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এ কাজ করি। সৌজন্য সংখ্যার বাইরে 
পড়ার জন্য অন্য কোন পত্রিকা চাইতেই হাসিমুখে বলতেন কিনে নাও। বাধ্য হয়ে পত্রিকা কিনে নিয়ে পড়তাম। একই সময়ে অনেক সাংবাদিকরা সেখানে জড়ো হত। চলতো চায়ের আড্ডাও। বয়সে ছোট হলেও একজন সহকর্মী হিসেবে তিনি আমাকে সম্মান দিতেন এবং স্নেহ করতেন।  

হঠাৎ বিদায়ের শোক
আব্দুল কাদিরের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই পার্বতীপুর প্রেসক্লাব, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ীদের মাঝে নেমে আসে গভীর শোক। বলা হয়, 'একজন মানুষ চলে গেলে সব শূন্য হয়ে যায় না, কিন্তু আব্দুল কাদিরের মতো মানুষ গেলে সাংবাদিকতায় সত্যিই শূন্যতা তৈরি হয়।'
সুদূর প্রবাসে বা আমেরিকায় বসে খবরটি শুনে হৃদয় ভেঙে গেল। এমন মানুষ খুব কমই দেখা যায়-যে সততার সঙ্গে এতটা পথ হাঁটে, বিনিময়ে কিছুই চায় না।
মৃত্যুকালে তিনি চার পুত্র, দুই কন্যা, স্ত্রী এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাদের চোখে তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল পিতা, কোমল হৃদয়ের মানুষ-আর সমাজের চোখে একজন আলোকিত সাংবাদিক।

কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে সফলতার শিখরে: এক মফস্বল সাংবাদিকের গল্প
বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতা যেখানে সংবাদ সংগ্রহ মানে শুধু ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়া নয়; বরং প্রতিদিনই লড়াই করা সত্য প্রকাশের, সততা ধরে রাখার এবং প্রতিকূলতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার। এমনই এক সংগ্রামী সাংবাদিকের নাম আব্দুল কাদির। যিনি দীর্ঘ চার দশক ধরে মফস্বলের কঠিন বাস্তবতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক নির্ভরযোগ্য ও পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে।

শুরুর পথ: অভাব, অনিশ্চয়তা আর বাধার পাহাড়
ছোটবেলায় লেখালেখির প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকলেও পরিবারিক দারিদ্র্য আব্দুল কাদিরের পথ কখনো সহজ করে দেয়নি। স্কুল-কলেজেই তিনি স্থানীয় দৈনিকে ফিচার লিখতে শুরু করেন,মাঝে মাঝে লেখা ছাপা হলেও পারিশ্রমিক ছিল না বললেই চলে। পরে একটি স্থানীয় পত্রিকায় অতি নগণ্য সম্মানীর বিনিময়ে সংবাদদাতা হন।
প্রথমদিকে তাঁকে নিজস্ব টাকায় ফোন-ফ্যাক্স, পরিবহন খরচ, এমনকি অফিসে খসড়া রিপোর্ট পাঠানোর কাগজ-কলম পর্যন্ত কিনে নিতে হতো। অনেক সময় রাতের বেলা দূরবর্তী গ্রামে ঘটনাস্থলে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন নিজের সুরক্ষা ঝুঁকি নিয়ে।

সততা ছিল সবথেকে বড় শক্তি
মফস্বল সাংবাদিকতার এক অঘোষিত নিয়ম তথ্য পাওয়ার জন্য চাপে পড়া, ক্ষমতাশালীদের প্রভাব, আবার অনেক সময় হুমকির মুখে পড়া। আব্দুল কাদিরের সেই চাপের কাছে কখনো মাথা নত করেননি। কোনো দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধি, দখলবাজদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে গিয়ে প্রাণের হুমকিও পেয়েছেন তিনি বারবার।
একবার স্থানীয় প্রভাবশালীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে রিপোর্ট প্রকাশের পর তাঁকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি থামেননি। সততার সঙ্গে নির্ভয়ে কাজ করে গেছেন।

অনেকেই সাক্ষাৎকারে বলেন,'কাদির ভাইয়ের কাছে কেউ অন্যায় প্রশ্রয় পায়নি। ক্ষমতাশালী কারও বিরুদ্ধে লিখতে হলে তিনিই ছিলেন সবার আগে।'
স্থানীয় প্রশাসনের কোনো অনিয়ম, মানুষের ভোগান্তি, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দাপট সবকিছুর বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছেন। সেই ধারাবাহিক সততা তাঁকে শুধু পরিচিতই করেনি মানুষের আস্থার জায়গায় দাঁড় করিয়েছিল।

পরিশ্রমের স্বীকৃতি: স্থানীয় থেকে জাতীয় গণমাধ্যমে
দীর্ঘদিনের নিষ্ঠার ফল অবশেষে আসে। একটি জাতীয় দৈনিক তাঁর প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপায়। এরপর শুরু হয় তাঁর জীবনের মোড় পরিবর্তন। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়, আর জনগণের আস্থা আরও ঘনীভূত হয়।
এরপর তাঁকে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় পত্রিকা পার্বতীপুর প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়। শুধু সংবাদ সংগ্রহ নয়, মানবিক গল্প, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সমাজের অন্ধকার কোণ তুলে ধরা তাঁর কাজগুলো জাতীয় পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

সফলতার শিখরে পৌঁছেও বিনয়ী
আব্দুল কাদির এখন এলাকার সবচেয়ে পরিচিত ও সম্মানিত সাংবাদিকদের একজন। স্বচ্ছতা, সাহসিকতা ও নিরলস পরিশ্রমের কারণে স্থানীয় প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ সবাই তাঁর ওপর আস্থা রাখেন। পরিবার-পরিজন, সহকর্মী সাংবাদিক, পাঠক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাঁকে একজন “বিশ্বস্ত সংবাদকর্মী” হিসেবেই চেনেন।
তবে সফলতার শিখরে থেকেও তিনি এখনো সেই প্রথম দিনের মতোই নিষ্ঠাবান। প্রতিদিন ভোরেই বের হন মফস্বলের মানুষের সুখ-দুঃখ, সমস্যা-সংকট তুলে ধরতে। তাঁর ভাষায়,
'সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, মানুষের পাশে থাকার দায়িত্ব'।

মফস্বল সাংবাদিকতার অনুপ্রেরণা
তাঁর এই যাত্রা প্রমাণ করে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সততা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে মফস্বলের মাঠ থেকেও একজন সাংবাদিক জাতীয় পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
আব্দুল কাদিরের গল্প শুধু তাঁর একার নয়এটি বাংলাদেশের অসংখ্য মফস্বল সাংবাদিকের সংগ্রাম, সাফল্য এবং সমাজ পরিবর্তনের অভিযাত্রার প্রতিচ্ছবি।

একজন মফস্বল সাংবাদিকের কঠিন পথচলা
মফস্বলের সাংবাদিকতা সহজ নয়। ক্ষমতাধরদের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, কখনও প্রশাসনিক অসহযোগিতা সবই নিত্য সঙ্গী। কিন্তু আব্দুল কাদির ছিলেন ব্যতিক্রম। অল্প বয়সে সাংবাদিকতা শুরু করলেও তিনি কখনো নীতির সঙ্গে আপস করেননি। কোনো ভয়-ভীতি তাঁর কলম থামাতে পারেনি। এ কারণেই পার্বতীপুরের সাংবাদিক মহলে তাঁর নামই ছিল সততার প্রতীক।
দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর পার্বতীপুর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও তিনি ছিলেন পার্বতীপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি। একই সঙ্গে ব্রাদার্স লাইব্রেরি এবং পার্বতীপুর সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু ব্যবসা নয়, তাঁর মনের সবচেয়ে কাছের জায়গা ছিল সাংবাদিকতা।

কঠিন সময় পাড়ি দিয়ে উঠে আসা একজন অনুকরণীয় মানুষ
জীবনের পথে বাধা তাঁর কম ছিল না। পরিবার-সংসার, দায়িত্ব, আর্থিক চাপে অনেক সময়ই হয়তো নতি স্বীকার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কখনো ভাঙেননি। অক্লান্ত পরিশ্রম, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্যের প্রতি অটল বিশ্বাস তাঁকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অনেকে বলেন, 'মফস্বলের সাংবাদিকতার মান আজ যে অবস্থানে এসেছে, তার বড় অবদানগুলোর একটি ছিল আব্দুল কাদির।'

শেষ কথা
মফস্বল সাংবাদিকতার কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আব্দুল কাদির প্রমাণ করেছেন-'সততার বিনিময়ে হয়তো দ্রুত সফলতা আসে না, কিন্তু প্রকৃত সফলতা আসে।' তিনি নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কর্ম, সাহস, নীতি-নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের পথ দেখাবে আরও বহু বছর।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি