১১ আগস্ট ২০২৬

রাশিয়া থেকে শুধু ‘তেল আমদানির’ কারণেই কি ভারতের ওপর ‘রুষ্ট’ ট্রাম্প

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৪২ পিএম
রাশিয়া থেকে শুধু ‘তেল আমদানির’ কারণেই কি ভারতের ওপর ‘রুষ্ট’ ট্রাম্প
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর রাশিয়ার প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান অনেক মানুষকে অবাক করেছিল। জাতিসংঘে বেশ কয়েকবারই যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সমর্থন করেছে, তা-ও আবার ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের বিষয়ে। এদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য হোয়াইট হাউসে গেলে তাঁদের মধ্যে তর্কাতর্কি বেঁধে যায়। সে সময় ট্রাম্প অভিযোগ তোলেন, জেলেনস্কি শান্তি চান না। এ-ও বলেন, জেলেনস্কি যদি সমঝোতা করতে রাজি না হন, তবে যুক্তরাষ্ট্র আর এ বিষয়ে থাকবে না। পাশাপাশি ইউক্রেন রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জিততে পারবে না, এমনও দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। এসব বিষয় মাথায় রেখে বিশেষজ্ঞদের মনে হয়েছিল, ভারত ও রাশিয়ার বন্ধুত্ব নিয়ে ট্রাম্পের কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু গত পাঁচ মাসে পরিস্থিতি বদলেছে এবং সেটা বেশ দ্রুতই। জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত-রাশিয়ার অংশীদারত্বকে ভালো চোখে দেখছেন না ট্রাম্প। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে ভারতের ওপর ‘রুষ্ট’ও হয়েছেন তিনি। বাণিজ্য শুল্ক দ্বিগুণ করে ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর কথা ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। এ নিয়ে যেমন ভারতীয় গণমাধ্যমে সমালোচনা হচ্ছে, তেমন রুশ গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কি এভাবে চাপ তৈরি করে রাশিয়া থেকে ভারতকে দূরে রাখতে পারবে? রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ ৯ আগস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সামনে এই একই প্রশ্ন রেখেছিল। সেই সময় রুশ নিরাপত্তা পরিষদের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য অ্যান্ড্রু সুশেন্তসভ জানিয়েছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প চাপ তৈরি করলেও ভারত মার্কিন বিদেশ নীতি অনুসরণ করবে না। তাঁর মতে, ভারতের ক্ষেত্রে এ ধরনের মার্কিন নীতি আগেও ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের এ চাপ বেশি দিন টিকবে না।

কারণ কি শুধুই ‘তেল’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের বিরুদ্ধে রাশিয়া থেকে তেল কিনে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে পরোক্ষভাবে জিইয়ে রাখার অভিযোগ তুলেছিলেন। এ কারণ দেখিয়েই বাড়তি বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করেন তিনি। সুশেন্তসভ বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ যে (ট্রাম্পের) বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ মস্কোয় প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে দেখা করার আগে তিনি (ট্রাম্প) ভারতের ওপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।’
‘ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে, তাই যুক্তরাষ্ট্র দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করেছে, এটা কিন্তু আসল কারণ নয়। ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এভাবে চাপ দেওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে’, বলেন সুশেন্তসভ। বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করেছেন সুশেন্তসভ। তাঁর মতে, ‘জনসংখ্যার নিরিখে ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় দেশ। ভারত দ্রুত উন্নতি করছে। চীনের সঙ্গে সংঘাতের কথা মাথায় রেখে ভারতকে নিজেদের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র।’ ‘এ পরিস্থিতিতে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) চায়, ভারত তাদের নেতৃত্ব মেনে নিক ও নিজেদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির তাগিদ থেকে সরে আসুক। কিন্তু যে কৌশলের হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে চাইছে, তা আদৌ লাভজনক হবে না। তাই ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ চাপও বেশি দিন থাকবে না’, বলেন সুশেন্তসভ।বাণিজ্যকে ঢাল করে আগেও যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলে উল্লেখ করেছেন সুশেন্তসভ। তিনি বলেন, ‘চাপ প্রয়োগ করা মার্কিন কৌশলের একটা অংশ। যখন এ কৌশল ব্যর্থ হয়, তখন প্রেসিডেন্ট নিজেই নিজের জয় ঘোষণা করেন এবং চুপচাপ আগের সিদ্ধান্তগুলো বদলে ফেলেন।’
যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যকে ঢাল করে বিষয়টাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যায়, যা উসকানির সমান। কিন্তু সেখানে সমঝোতার জন্য খুবই কম জায়গা থাকে। উদাহরণস্বরূপ সুশেন্তসভ ব্রাজিলের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। তিনি বলেন, ‘ব্রাজিলের ক্ষেত্রে ট্রাম্প তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ শুরু করেন। সে দেশের বিরোধীদের সমর্থন করছেন ট্রাম্প। এতে প্রতিরোধ বাড়তে থাকে। শুধু তা-ই নয়, এর ফলে প্রভাবিত দেশগুলো এক সময় প্রতিক্রিয়ার পথও খুঁজতে শুরু করে।’ মার্কিন চাপের মধ্যেই রাশিয়া সফরে অজিত দোভাল মার্কিন চাপের মুখে পড়েও এখনো রাশিয়ার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে দেখা যায়নি ভারতকে। ৬ আগস্ট ভারতের ওপর আরও ২৫ শতাংশ বাণিজ্য শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ৭ আগস্ট ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল রাশিয়া পৌঁছান। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। সেই সময় অজিত দোভাল বলেছিলেন যে চলতি বছরের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারতে আসবেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পুতিনের কথা হয় ৮ আগস্ট। তিনিও জানান, পুতিন চলতি বছর ভারত সফরে আসতে চলেছেন। একই তথ্য প্রকাশিত হয় রুশ গণ্যমাধ্যমে। ‘রাশিয়া টুডে’তে ৭ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের শেষের দিকে নয়াদিল্লি সফরে যাবেন ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চলতি মাসের শেষের দিকে রাশিয়া সফর করবেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যখন রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করার জন্য ভারতের ওপর চাপ ছিল, সেই সময় রাশিয়া সফরে এসেছিলেন অজিত দোভাল। ভারত-রাশিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিরল খনিজ, বিমানের যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও রেলপথে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে একই কথা বলা হচ্ছে। দোভাল আরও এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন। বর্তমানে ভারতের কাছে তিনটি এস-৪০০ ব্যবস্থা রয়েছে। অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারত সেগুলো ব্যবহার করেছিল। রুশ মিডিয়া গ্রুপ রুসিয়া সেগোদনায়ার মহাপরিচালক দিমিত্রি কিসেলেভ গত সপ্তাহে ‘স্পুতনিক নিউজ’কে বলেন, ‘ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বন্ধুত্ব দুই দেশের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন আলটিমেটামের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ছিল যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের ওপর কোনো চাপ তৈরি করা যাবে না। ভারত ও রাশিয়ার সাধারণ মানুষও পরস্পরকে বিশ্বাস করেন।’

রাশিয়া নয়, ভারতকে ‘সাজা’

লেই টার্নার ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ইউক্রেনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। মস্কো টাইমসের এক প্রতিবেদনে পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে আসন্ন শীর্ষ বৈঠকের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। লেই টার্নার লেখেন, ‘আগে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। কিন্তু এখন ৫০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করা হয়েছে। ২৭ আগস্টের আগে এ ট্যারিফও প্রযোজ্য হবে না।’ এর আগে ১৫ আগস্ট পুতিন ও ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য নিশানা করা হয়নি। টার্নার মনে করেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের জন্য ভারতকে শাস্তি দেওয়া মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে অনেকটা ‘ইউ-টার্ন’-এর মতো। কারণ, এর আগে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে স্বৈরশাসক বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর রাশিয়ার পক্ষ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ২০১৪ সালের আগে ইউক্রেনের সীমানা যেমন ছিল, তা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয় এবং তারা ন্যাটোতেও যোগ দিতে পারবে না।
টার্নার লেখেন, ‘ইউক্রেনের স্বার্থ উপেক্ষা করে পুতিন ও ট্রাম্পের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা করতে পারে। রাশিয়ার ওপর নতুনভাবে শুল্ক আরোপের জন্য ট্রাম্প কিছুই করেননি। অথচ চাইলে অনেক কিছুই করতে পারত। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেল ট্যাংকারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। রাশিয়ার তেল বাণিজ্যে সহায়তাকারী ব্যাংক ও শোধনাগারগুলোর ওপরও আলাদাভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি।’ ‘এখন আশঙ্কা জন্মাচ্ছে যে ট্রাম্প এমন এক চুক্তিতে রাজি হতে পারেন, যার ফলে ইউক্রেন তাদের জমি হারাবে এবং যদি ইউক্রেন তা অস্বীকার করে, তবে রাজি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিতে থাকবে।’ টার্নার লেখেন, ‘জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেশ কয়েকবারই এমনটা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, তারা ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানও ব্যাহত করেছে। কিন্তু রাশিয়ার ওপর কোনো চাপ দেয়নি।’ [বাংলা প্রেস বিশ্বব্যাপী মুক্তচিন্তার একটি সংবাদমাধ্যম। স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের জন্য নিরপেক্ষ খবর, বিশ্লেষণ এবং মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজ আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।] বিপি>টিডি
[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি