৫ মে ২০২৬

পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার নামে যুক্তরাষ্ট্রের 'পাগলামি' বন্ধের আহবান

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:১৯ পিএম
পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার নামে যুক্তরাষ্ট্রের 'পাগলামি' বন্ধের আহবান

নোমান সাবিত: ভালো বা মন্দ যেভাবেই হোক, কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হয়েছে ৩৫ বছর আগে, তাই আজকের অধিকাংশ আমেরিকানের এ ধরনের অস্ত্র সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা বা আগ্রহ নেই—যে অস্ত্রগুলো মুহূর্তের মধ্যে আমাদের সমাজের বিশাল অংশ ধ্বংস করতে পারে। স্ট্যানলি কুবরিকের বিখ্যাত চলচ্চিত্র “ড. স্ট্রেঞ্জলাভ” তখনকার পারমাণবিক প্রতিরোধনীতি “মিউচুয়াল অ্যাসিউরড ডিজাস্ট্রাকশন” বা পরস্পর নিশ্চিহ্ন হওয়ার হুমকিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করেছিল।
ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ককে 'এক বোতলে বন্দী দুই বিচ্ছু'-এর মতো বলে বর্ণনা করা হতো—দুজনই একে অপরকে হুল ফোটাতে সক্ষম। আজ সেই বোতলে অন্তত তিনটি বিচ্ছু রয়েছে চীন এখন এমন এক কৌশলগত পারমাণবিক শক্তি গড়ে তুলছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সমকক্ষ হতে পারে।
এই তিন দেশের বাইরে, 'একই ঘরে' বসবাস করছে আরও কয়েকটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স, উত্তর কোরিয়া, ইসরায়েল, ভারত ও পাকিস্তান। ইরান ও সৌদি আরব যেন সেই ঘরের বারান্দায় অপেক্ষায়।
সম্প্রতি নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর মন্তব্য যে যুক্তরাষ্ট্র আবার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা শুরু করবে—এই ইস্যুটিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
নিউ স্টার্ট চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া প্রত্যেকে সর্বোচ্চ ১,৫৫০টি মোতায়েনকৃত পারমাণবিক ওয়ারহেড ও ৮০০টি লঞ্চার রাখার অনুমতি পেত। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চুক্তির এই সীমা স্বেচ্ছায় বজায় রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন।
কিন্তু ট্রাম্পের 'পরীক্ষা' সম্পর্কিত মন্তব্য পুরো অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন আসল বিস্ফোরণসহ পরীক্ষার কথা? না কি এমন পরীক্ষার কথা, যেখানে নিউক্লিয়ার ফিশন বা ফিউশন হয় না? নাকি তিনি শুধু লঞ্চার পরীক্ষা বোঝাচ্ছেন?
যদি বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষার কথাই হয়ে থাকে, তবে বিশেষজ্ঞরা একে অতি বিপজ্জনক ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন।
এরপর, ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রকে 'গোল্ডেন ডোম' অর্থাৎ এক অদম্য প্রতিরক্ষা ছাতার নিচে আনার প্রস্তাব দেন, তখনই পুতিন রাশিয়ার 'স্কাইফল' ও 'পোসাইডন' মিসাইল প্রকল্প নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন।
'স্কাইফল' (নেটোর নামকরণ অনুযায়ী) একটি পারমাণবিকচালিত, পারমাণবিক ওয়ারহেডযুক্ত ক্রুজ মিসাইল, যার পরিসর প্রায় সীমাহীন। 'পোসাইডন' হলো পারমাণবিকচালিত, পারমাণবিক ওয়ারহেডযুক্ত ড্রোন টর্পেডো, যা সমুদ্র পাড়ি দিতে পারে।
স্কাইফল ভূমির কয়েক ফুট ওপরে উড়ে যেকোনো দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে। আর পোসাইডন নিরবে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর যেমন নিউ ইয়র্ক বা সান ফ্রান্সিসকো অভিমুখে এগিয়ে গিয়ে বহু-মেগাটন ওয়ারহেড বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
একটি মেগাটন অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা জাপানে ১৯৪৫ সালে ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়ে প্রায় এক হাজার গুণ বেশি। একাধিক পোসাইডন হামলা পুরো আমেরিকার অর্থনীতি ধ্বংস করে দিতে পারে।
এদিকে, আধুনিক প্রচলিত অস্ত্র এখন এতটাই নিখুঁত যে, সেগুলোও এসব কৌশলগত পারমাণবিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সক্ষম—যেমন টমাহক ক্রুজ মিসাইল বা দূরপাল্লার কনভেনশনাল বোমা। অথচ এসব অস্ত্র কোনো অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ চুক্তির আওতায় নেই। যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তিও বাতিল করেছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এখনকার মার্কিন সরকারে পারমাণবিক কৌশল নিয়ে কাজ করার মতো অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা দ্রুত কমে গেছে। বর্তমান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফদের কারওই এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই, কারণ দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ মার্কিন অগ্রাধিকারে ছিল না। হোয়াইট হাউসেও একই অবস্থা।
চীন এখনো কোনো অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ আলোচনায় যোগ দিতে আগ্রহ দেখায়নি সম্ভবত তারা নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নেওয়ার অপেক্ষায় আছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো এই পরিস্থিতিতে কী করা সম্ভব? অন্তত নেতৃবৃন্দ কি এ ব্যাপারে একমত হতে পারেন না যে, পারমাণবিক অস্ত্র কখনো ব্যবহার করা যাবে না এবং পারমাণবিক যুদ্ধ কখনো লড়া যাবে না?
সম্ভাব্য বিকল্প খুব বেশি নেই। চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। পারমাণবিক স্থাপনার পারস্পরিক পরিদর্শন, নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার চুক্তি হতে পারে আস্থার সূচনা। সামরিক পর্যায়ের সংলাপও সহায়ক হতে পারে। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর এমন আলোচনা এখন বাস্তবসম্মত কি না, সেটাই প্রশ্ন।
সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো—যে কোনো “কাইনেটিক” পারমাণবিক পরীক্ষা, অর্থাৎ আন্ডারগ্রাউন্ড, স্থল বা আকাশে বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষা, সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ রাখা। অন্যথায় নতুন ও বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে যা মানবজাতির পক্ষে একেবারেই সহনীয় নয়।

বিপি/এসএম
 

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি