৪ মে ২০২৬

কোভিড ত্রাণ জালিয়াতি

নিউ ইয়র্কে ত্রাণ তহবিল জালিয়াতি মামলায় ৯ বাংলাদেশির ২৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের সম্ভাবনা

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
নিউ ইয়র্কে ত্রাণ তহবিল জালিয়াতি মামলায় ৯ বাংলাদেশির ২৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের সম্ভাবনা

কোভিড ত্রাণ জালিয়াতি

নোমান সাবিত: নিউ ইয়র্কে কোভিড-১৯ মহামারির সময় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তার জন্য বরাদ্দ দুর্যোগ তহবিল থেকে হাজার হাজার ডলার আত্মসাতের অভিযোগ স্বীকারকারী নয়জন অর্থ লুটেরা বাংলাদেশির ১৫ থেকে ২৫ বছর কারাদন্ডের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আদালতের সুত্রে জানা গেছে। মহামারি কোভিডের অর্থ লুটেরা এই  ৯ বাংলাদেশি ইতোমধ্যে আদালতে তাদের নিজেদের দোষ স্বীকার করেছেন এবং তাদের পরিচয়ও মিলেছে।
আদালতের সুত্র জানায় ১০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ ফেরত দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় বেশ কয়েক জনের ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কুইন্সের জেলা অ্যাটর্নি মেলিন্ডা ক্যাটজ এবং নিউ ইয়র্ক স্টেটের ইন্সপেক্টর জেনারেল লুসি ল্যাং -এর দপ্তর সুত্রে এ খবর জানা গেছে।
কুইন্সের জেলা অ্যাটর্নি কাটজ বলেন, এই নয়জন অভিযুক্ত স্বীকার করেছেন যে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিপর্যস্ত ব্যবসাগুলোকে সহায়তার জন্য বরাদ্দ নিউ ইয়র্ক রাজ্যের তহবিল থেকে তারা হাজার হাজার ডলার চুরি করেছেন। এই তহবিল ছিল নজিরবিহীন সংকটে নিউ ইয়র্কবাসীকে টিকে থাকতে সহায়তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দোষ স্বীকারের ফলে এখন তাদের সেই অর্থ ফেরত দিতে হবে। আমি আমার দপ্তরের ফ্রডস ব্যুরো এবং নিউ ইয়র্ক স্টেট ইন্সপেক্টর জেনারেলের অফিসকে ধন্যবাদ জানাই, যারা তাদের জবাবদিহির আওতায় এনেছে।
ইন্সপেক্টর জেনারেল লুসি ল্যাং বলেন,ব্যক্তিগত লাভের জন্য দুর্যোগ সহায়তা তহবিলের অপব্যবহার সব সময়ই অপরাধ এবং লজ্জাজনক, তবে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটের সময় তা আরও বেশি নিন্দনীয়। আজকের দোষ স্বীকার এবং করদাতাদের এক মিলিয়ন ডলার উদ্ধারের জন্য আমার দপ্তরের নিবেদিত দল, ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি কাটজ ও তার সহকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশীদারদের ধন্যবাদ। লোভকে জনস্বার্থের ওপরে রাখার ঘটনা নিউ ইয়র্ক কখনোই মেনে নেবে না।
নয়জন অভিযুক্ত মে ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখে কুইন্স সুপ্রিম কোর্টে চতুর্থ ডিগ্রির গ্র্যান্ড লারসেনি ও পেটি লারসেনির অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং তাদের মোট ১০ লাখ ৯১ হাজার ৭২০ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার নিউ ইয়র্ক স্টেটে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
ডিএ কাটজ জানান, তদন্তে দেখা গেছে ২০২০ সালের জুনের দিক থেকে অভিযুক্তরা নিউ ইয়র্ক স্টেটের 'এম্পায়ার ডেভেলপমেন্ট প্যান্ডেমিক স্মল বিজনেস রিকভারি গ্র্যান্ট প্রোগ্রাম'-এর আওতায় একাধিক ছোট ব্যবসার নামে বহু আবেদন জমা দেন।


প্রতিটি আবেদনে তারা দাবি করেন যে অর্থটি বেতন, বাণিজ্যিক ভাড়া বা মর্টগেজ, ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য সরঞ্জামের খরচ মেটানোর জন্য প্রয়োজন। কিন্তু বেশিরভাগ অর্থ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।
ব্যাপক ব্যাংক রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনুদান পাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোর কোনো প্রকৃত কার্যক্রম ছিল না এবং জমা দেওয়া ট্যাক্স রিটার্নে উল্লেখিত আয়ের বা ব্যয়ের কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
নিউ ইয়র্ক স্টেট ইন্সপেক্টর জেনারেলের দপ্তর প্রথমে এই তহবিল অপব্যবহারের তদন্ত শুরু করে এবং ২০২৪ সালের মে মাসে মামলাটি কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির দপ্তরে হস্তান্তর করে।
অভিযোগের কথা জানার পর অভিযুক্তরা ২০২৫ সালের ৬ থেকে ৯ মে’র মধ্যে পৃথকভাবে কুইন্স জেলা অ্যাটর্নির দপ্তরে আত্মসমর্পণ করেন।
এই তদন্ত পরিচালিত হয় কুইন্স জেলা অ্যাটর্নির দপ্তর এবং নিউ ইয়র্ক স্টেট অফিস অব দ্য ইন্সপেক্টর জেনারেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায়, পাশাপাশি নিউ ইয়র্ক পুলিশের একটি বিশেষ দল সহায়তা প্রদান করে।
আদালতে দোষ স্বীকার করা অভিযুক্ত বাংলাদেশিরা হলেন: 
১। এস্টোরিয়ার বাসিন্দা মাহবুব মালিক (৪১), তিনি ইতিমধ্যে নিজের দোষ স্বীকার করে তিন বছরের জন্য শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পেয়েছেন। তার দেশের বাড়ি পাবনা জেলায়।
২। জ্যামাইকার ১৫০ নম্বর স্ট্রিটের বাসিন্দা তুফায়েল আহমেদ (৫০) এর দেশের বাড়ি নোয়াখালী জেলার চাটখিল এলাকায়। তিনি ‘১২৭ রিভিংটন কর্প’ এবং ‘ড্রেসডেন অ্যাসোসিয়েটস’ নামক দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১১ লক্ষ ডলার আত্মসাৎ করেছেন। লোন পাওয়ার মাত্র একদিন আগে তিনি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেন। একই দিনে ডিপোজিট ও উইথড্র করেছেন বলে উল্লেখ করেছে কুইন্স জেলা অ্যাটর্নির দপ্তর।
৩। এলমহার্স্টের এই বাসিন্দা ইউসুফ এমডি (৪৫)-এর দেশের বাড়িও নোয়াখালী অঞ্চলে। তোফায়েল আহমেদের সাথে যোগসাজশে তিনি তিনটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ১.৪ মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছেন। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তার ২৫ বছর পর্যন্ত জেল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৪। জ্যাকসন হাইটসের এই প্রবীণ ব্যক্তি মোহাম্মদ চৌধুরী ওরফে খোকন আশরাফ (৬৮)-এর দেশের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তিনি ৫টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ২ লক্ষ ২৯ হাজার ডলার চুরির দায়ে অভিযুক্ত। একসময় তিনি জাকির চৌধুরির পার্টনার ছিলেন।
৫। নিউ হাইড পার্কের বাসিন্দা নাদিম শেখ (৫৬) বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। তিনি দুটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১ লক্ষ ডলার আত্মসাৎ করেছেন।
৬। জ্যামাইকার গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল পার্কওয়ের বাসিন্দা জাকির এইচ চৌধুরী (৫৯) বর্তমানে কমিউনিটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তার দেশের বাড়ি নোয়াখালি জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলায়। যুক্তরাষ্ট্র যুবদলের সাবেক সভাপতি ৬টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ২ লক্ষ ৮৭ হাজার ৬০৮ ডলার আত্মসাৎ করেছেন। আদালতে দোষ স্বীকারের পর তিনি গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর এক লক্ষ ডলার এবং ২৩ ডিসেম্বর আরও ৭৫ হাজার ডলার ফেরত দিয়েছেন। বাকি ৭৫ হাজার ডলার আগামী ২৩ মার্চের মধ্যে পরিশোধ করার শর্তে তিনি বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
৭। জ্যামাইকা হিলসের বাসিন্দা মোহাম্মদ খান (৪৯) -এর দেশের বাড়ি সিলেট সদর এলাকায়। তিনি ৭টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৬ লক্ষ ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারে।
৮। লং আইল্যান্ডের ফার্মিডেলের বাসিন্দা তানভীর মিলন (৫৫) -এর বিরুদ্ধে অভিযোগ সবচেয়ে বড়। ৯টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি প্রায় ২.৭ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তানভীরের আদি নিবাস ঢাকা বিক্রমপুর অঞ্চলে বলে জানা গেছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার ২৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
৯। লং আইল্যান্ডের ডিয়ার পার্কের বাসিন্দা জুনেদ খান (৫৬)-এর দেশের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলায়। তিনি ৮টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ২ লক্ষ ডলার আত্মসাৎ করেছেন।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি