নিউ ইয়র্ক সিটির তিন মেয়রপ্রার্থীর শেষ বিতর্কে উত্তেজনা ও তীব্র বাকযুদ্ধ
ছাবেদ সাথী: নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনের তিন প্রার্থী বুধবার (নির্বাচনের দিন থেকে দুই সপ্তাহেরও কম বাকি থাকতে) শেষবারের মতো এক মঞ্চে মুখোমুখি হন।
ডেমোক্র্যাট অ্যাসেম্বলিম্যান জোহরান মামদানি, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো এবং রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়া তিন প্রার্থীর মধ্যে বিতর্কে ছিল তুমুল তর্ক-বিতর্কের ঝড়। কুয়োমো ও স্লিওয়া বেশিরভাগ সময়ই মামদানির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে আক্রমণ চালান।
তবে একাধিক জরিপে মামদানিকে স্পষ্টভাবে এগিয়ে থাকতে দেখা যাওয়ায়, এই বিতর্ক ভোটারদের মনোভাব কতটা পরিবর্তন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে।
কুয়োমো বনাম মামদানি: রেষারেষি থেকে রণক্ষেত্র
এটি ছিল কুয়োমোর শেষ সুযোগ মঞ্চে মামদানিকে রক্ষণের ভঙ্গিতে ঠেলে দিয়ে নিজেকে নিউ ইয়র্কের নিরাপদ নেতৃত্ব বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার। কুয়োমো মামদানির অভিজ্ঞতার অভাব ও ‘অবাস্তব’ রাজনৈতিক ভাবনার সমালোচনা করেন। পাশাপাশি ইসরায়েল নিয়ে মামদানির অবস্থানকেও তিনি আক্রমণ করেন।
কুয়োমো বলেন, আমি কাজ করেছি। তুমি কখনও চাকরি করোনি, কিছুই অর্জন করোনি। আট মিলিয়ন মানুষের জীবন পরিচালনার যোগ্যতা তোমার নেই। ভোটে ৮০ শতাংশ সময় তুমি অনুপস্থিত ছিলে লজ্জা হওয়া উচিত।
মামদানিও প্রস্তুত হয়ে আসেন। তিনি কুয়োমোকে 'ক্ষমতা হারানো এক মরিয়া মানুষ হিসেবে আখ্যা দেন, যিনি ডানপন্থীদের কথাবার্তা পুনরাবৃত্তি করছেন। মামদানি আরও বলেন, অ্যান্ড্রু কুয়োমো আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুতুল।
তিনি বলেন, যে কেউ টেলিভিশন খুললেই দেখতে পাবে, ট্রাম্প বলছেন তাঁর পছন্দের মেয়রপ্রার্থী কুয়োমো। কারণ নিউ ইয়র্কের জন্য নয়, নিজের সুবিধার জন্য তিনি তাঁকে মেয়র হিসেবে চান।
তর্ক এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, উপস্থাপক এরল লুইস মাঝেমধ্যে দুজনকেই থামিয়ে দেন। একটি মজার মুহূর্তও আসে যখন মামদানিকে জিজ্ঞেস করা হয়, মহামারির সময় কুয়োমো কি কিছু সঠিক করেছিলেন কিনা। মামদানি বলেন, আমি যেভাবে কোভিড টিকা পেয়েছি, সেটি কার্যকর ছিল।কুয়োমো ধন্যবাদ দিলে মামদানি যোগ করেন, আমি সেটা শহরের টিকাকেন্দ্র থেকে পেয়েছিলাম।
কুয়োমোর প্রচেষ্টা: মামদানির জয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি
মামদানি যেখানে কুয়োমোকে ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন, কুয়োমো ঠিক উল্টো পথে হাঁটেন তিনি সতর্ক করেন, মামদানি জিতলে ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক সিটির প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হবেন।
কুয়োমো বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। যদি মামদানি জেতে, ট্রাম্প শহরটি দখল করতে চাইবে—ওকে ‘ছেলে’ মনে করে মাটিতে ফেলে দেবে। এভাবে কুয়োমো মামদানির বক্তব্য উল্টে ট্রাম্প-ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করেন।
যদিও ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নিজ শহরের মেয়র নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবেন না, তবে মামদানিকে মেয়র হিসেবে দেখার ব্যাপারে তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, মামদানির জয় রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি 'রাজনৈতিক উপহার' হবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ট্রাম্প তাঁর সহযোগীদের বলেছেন, মামদানি নির্বাচনে অপ্রতিরোধ্য।
স্লিওয়ার জোরালো উপস্থিতি
নিউ ইয়র্কের মতো উদারপন্থী শহরে রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়াকে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। কুয়োমোর সহযোগীরা এমনকি তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যেতে বলেছিলেন, দাবি করেন তিনি থাকলে মামদানির সুযোগ বাড়বে।
কিন্তু স্লিওয়া মঞ্চে দৃঢ়ভাবে জানান, তিনি শেষ পর্যন্ত লড়বেন। বিতর্কে একাধিকবার তিনি দর্শকদের করতালি পান।
তিনি কুয়োমোকে উদ্দেশ করে বলেন, অ্যান্ড্রু, তুমি পদত্যাগ করোনি, বরং ডেমোক্র্যাটদের অভিশংসনের হাত থেকে পালিয়ে গিয়েছিলে।
তিনি কুয়োমো ও মামদানিকে একাধিকবার 'দুই স্কুলছাত্র' বলে অভিহিত করেন এবং নিজেকে পরিপক্ক প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করেন।
সরব দর্শক, উত্তপ্ত পরিবেশ
প্রথম বিতর্কের তুলনায় এবার মঞ্চে সরাসরি দর্শক উপস্থিত ছিলেন। সাধারণত দর্শকদের শান্ত থাকতে বলা হয়, কিন্তু বুধবারের ৯০ মিনিটের বিতর্কজুড়ে দর্শকরা বারবার উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিন প্রার্থীই তাদের সমর্থকদের করতালি পেয়েছেন।
সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে যখন মামদানি জানান, তাঁর অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছেন শার্লট বেনেট, যিনি গভর্নর থাকা অবস্থায় কুয়োমোর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছিলেন।
মামদানি বলেন, শার্লট বেনেট আজ এখানে আছেন। তুমি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসা নথি হাতানোর চেষ্টা করেছিলে। এখন তিনি কথা বলতে পারেন না, কারণ তুমি তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছ। আমি তবে বলতে পারি তুমি যে ১৩ জন নারীকে হয়রানি করেছ, তাঁদের কী বলবে?
কুয়োমো জবাব দেন, সব অভিযোগই খারিজ হয়েছে।
কোনো নাটকীয় পরিবর্তন নয়
যদিও বিতর্কটি রাজনৈতিক আগ্রহীদের জন্য উত্তেজনাপূর্ণ ছিল, বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি নির্বাচনের গতিপথ বদলাবে না। কোনো বড় নতুন খবর বা নাটকীয় ঘটনা ঘটেনি। সব আক্রমণ ও বিতর্কের মধ্যেও মামদানির এগিয়ে থাকার গতি থামেনি।
এএআরপি ও গোথাম পোলিং–এর সর্বশেষ জরিপে মামদানির সমর্থন ৪৩.২%, কুয়োমোর ২৮.৯% এবং স্লিওয়ার ১৯.৪%।
শেষ বিতর্কে উত্তেজনা ও তীব্র বাকযুদ্ধ থাকলেও, প্রগতিশীল প্রার্থী জোহরান মামদানি এখনো নিউ ইয়র্কের পরবর্তী মেয়র হিসেবে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মুখ।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
গুলির শব্দে হোয়াইট হাউস অবরুদ্ধ, সরিয়ে নেওয়া হলো সংবাদকর্মীদের
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি