বিশ্বসভায় আমার পঁচিশ বছর
জাতিসংঘের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখা পৃথিবী
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চ—জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন
ছাবেদ সাথী
দিনাজপুরের একটি মফস্বল শহর থেকে সাংবাদিকতার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই পথ একদিন আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চ—জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নিয়ে যাবে, তা কোনোদিন কল্পনাও করিনি। আরও ভাবিনি, টানা পঁচিশ বছর ধরে এই বিশ্বসভার সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের সঙ্গে আমার জীবন জড়িয়ে থাকবে।
১৯৮৫ সালে উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। এরপর ঢাকায় জাতীয় দৈনিক আজকের কাগজ, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, অবজারভার ও দৈনিক রূপালীতে কাজ করেছি। ১৯৯৮ সালে ডাইভারসিটি ভিসা বা ডিভি লটারির সুবাদে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সুযোগ হয়। পেছনে ফেলে আসি পরিচিত দেশ, পরিচিত সংবাদপত্রের জগৎ; সামনে তখন সম্পূর্ণ নতুন এক জীবন।
কিন্তু সাংবাদিকতা আমাকে ছাড়েনি। বরং নিউ ইয়র্কে এসে আমার সামনে খুলে যায় সাংবাদিকতার আরেক বিশাল দরজা—জাতিসংঘ।
যে ভবনে কয়েক দিনের জন্য এসে জড়ো হয় গোটা পৃথিবী
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কেবল রাষ্ট্রপ্রধানদের বক্তৃতা দেওয়ার বার্ষিক অনুষ্ঠান নয়। সেপ্টেম্বর এলেই নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের ইস্ট রিভারের তীরের সেই ভবনটি কার্যত পরিণত হয় পৃথিবীর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক রাজধানীতে।
পৃথিবীর প্রায় সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা একই শহরে সমবেত হন। যুদ্ধ ও শান্তি, দারিদ্র্য ও উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী সংকট, মানবাধিকার, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবীর নানা প্রশ্ন সেখানে আলোচিত হয়।
কিন্তু সাধারণ পরিষদের মূল মঞ্চে দেওয়া ভাষণই সব নয়। আমার পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক সময় মূল অধিবেশনের বাইরের বৈঠকগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। করিডরের সাক্ষাৎ, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, ছোট কক্ষে রুদ্ধদ্বার আলোচনা, সংবাদ সম্মেলন কিংবা আকস্মিক কূটনৈতিক কথোপকথন—কখনো কখনো এগুলোই পরবর্তী সময়ের বড় সংবাদের জন্ম দেয়।
একজন সাংবাদিকের কাছে তাই জাতিসংঘ ভবন শুধু একটি সম্মেলনকেন্দ্র নয়; এটি এক বিশাল সংবাদভাণ্ডার।
একজন মফস্বল সাংবাদিকের বিশ্বসভায় প্রবেশ
২০০১ সাল থেকে আমি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সংবাদ সংগ্রহ শুরু করি। তখন ঢাকার কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে ফ্রিল্যান্স হিসেবে কাজ করতাম।
প্রথম দিকে জাতিসংঘ ভবনে প্রবেশের সময় আমার মধ্যে যে অনুভূতি কাজ করত, আজও তা মনে পড়ে। দিনাজপুরের সেই তরুণ সাংবাদিকটি যেন হঠাৎ করেই পৃথিবীর মানচিত্রের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।
একই ভবনের একদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্যদিকে বিশ্বের কোনো পরাশক্তির প্রেসিডেন্ট। পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান কিংবা বিশ্বখ্যাত কূটনীতিক। চারদিকে শত শত দেশের সাংবাদিক।
সেখানে দাঁড়িয়ে বারবার মনে হয়েছে—সাংবাদিকতার পৃথিবীর কোনো সীমানা নেই। একজন সাংবাদিক কোথা থেকে এসেছেন, সেটি শেষ কথা নয়; তিনি কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে সংবাদ খুঁজছেন, সেটিই আসল পরিচয়।
২০১০ সাল থেকে ঢাকার জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ, সমকালসহ আরও কয়েকটি সংবাদপত্রের নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধির দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘে আমার যাতায়াত আরও নিয়মিত হয়ে ওঠে। এরপর টানা প্রায় ১৫ বছর সেপ্টেম্বর এলেই আমার জীবনের একটি সপ্তাহ যেন জাতিসংঘকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।
২৫০ মাইলের পথ এবং সাত দিনের যুদ্ধ
আমি বসবাস করি কানেকটিকাটে। নিউ ইয়র্কে যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রায় ২৫০ মাইলের পথ। সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে প্রতিদিন এত দূর যাতায়াত করে সংবাদ সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব।
তাই প্রতিবছর কর্মস্থল থেকে সাত দিনের ছুটি নিতাম। সেই সাত দিন ছিল আমার কাছে এক ধরনের সাংবাদিকতার যুদ্ধ।
সকাল থেকে জাতিসংঘ। এক অনুষ্ঠান থেকে আরেক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের কর্মসূচি, রাষ্ট্রনেতাদের ভাষণ, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন—সবকিছুর ওপর চোখ রাখতে হতো। আজকের মতো তখন স্মার্টফোন ও তাৎক্ষণিক ডিজিটাল যোগাযোগ এত সহজ ছিল না। সংবাদ সংগ্রহ করে সেটি লিখে দ্রুত ঢাকায় পাঠানোর মধ্যেও ছিল আলাদা চাপ।
দিন শেষ হতো, কিন্তু সাংবাদিকের কাজ শেষ হতো না।
গাড়িই যখন আমার হোটেল
এই পঁচিশ বছরের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিগুলোর একটি থাকার জায়গা নিয়ে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সময় নিউ ইয়র্কে হোটেলের কক্ষ পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি ব্যয়বহুল। আমার মতো একজন প্রবাসী সাংবাদিকের পক্ষে প্রতিবছর ম্যানহাটনের হোটেলে থাকা সহজ ছিল না।
সংবাদ লিখে ঢাকায় পাঠাতে পাঠাতে অনেক দিন ম্যানহাটন থেকে জ্যাকসন হাইটসে ফিরতে গভীর রাত হয়ে যেত। বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে রাস্তার পাশে পার্ক করা নিজের গাড়িতেই ঘুমিয়েছি রাতের পর রাত। গাড়ির সিট পেছনে হেলিয়ে সেটিই হয়ে উঠেছে আমার বিছানা। আবার কোনো কোনো বছর কোনো বন্ধুর বাড়ির ভূগর্ভস্থ ছোট ঘরে জায়গা হয়েছে। কখনো রান্নাঘরের পাশে রাখা সোফা-কাম-বেডে রাত কেটেছে। সকালে উঠে মুখ-হাত ধুয়ে, সামান্য নাস্তা করে আবার ছুটে গেছি ম্যানহাটনের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে।
আজ পেছনে তাকালে সেই কষ্টগুলোকে আর কষ্ট বলে মনে হয় না। মনে হয়, সেগুলোই আমার সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
জ্যাকসন হাইটসের সেই রাতগুলো
জাতিসংঘের ব্যস্ত দিন শেষে জ্যাকসন হাইটসে ফিরে আসার মধ্যেও ছিল অন্যরকম আনন্দ। নিউ ইয়র্কের এই বাঙালি পাড়ায় তখন জমে উঠত বাংলাদেশের রাজনীতি, সাংবাদিকতা আর প্রবাসজীবনের নানা আলোচনা। গভীর রাত পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা চলত। পরদিন আবার ভোরে উঠে বিশ্বসভার সংবাদ সংগ্রহে ছুটে যাওয়া।
কখনো শরীর বলেছে, আর পারছি না। কিন্তু সাংবাদিকের মন বলেছে—আগামীকাল হয়তো এমন কিছু ঘটবে, যা ইতিহাস হয়ে থাকবে। সেই আকর্ষণই আমাকে বারবার জাতিসংঘে ফিরিয়ে নিয়েছে।
সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এখানে একটি ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রও বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর পাশাপাশি নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, উন্নয়ন, অভিবাসন, শ্রমবাজার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায্যতার মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জাতিসংঘ।
তবে জাতিসংঘে একটি ভাষণ দিয়েই কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয় না। সেই ভাষণের পাশাপাশি কতটি কার্যকর বৈঠক হলো, কোন দেশের সঙ্গে কী আলোচনা হলো, কোন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া গেল এবং দেশে ফিরে তার কতটা বাস্তবায়িত হলো—এসব দিয়েই শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক অর্জন বিচার করতে হয়।
সাংবাদিকের দায়িত্বও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়ে দেওয়া সাংবাদিকতা নয়। কী বলা হলো, কেন বলা হলো, কী বলা হলো না এবং ঘোষণার বাস্তব তাৎপর্য কী—সাংবাদিককে সেই প্রশ্নগুলো করতে হয়।
বিশ্বসভায় বাংলাদেশকে দেখার অভিজ্ঞতা
পঁচিশ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং প্রতিনিধি দলের জাতিসংঘ সফর কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, প্রতিনিধি দলের সদস্য বদলেছেন—কিন্তু জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা বদলায়নি।
আরেকটি বিষয় খুব কাছ থেকে দেখেছি—বাংলাদেশের রাষ্ট্রনেতার নিউ ইয়র্ক সফর শুধু জাতিসংঘ ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে নিউ ইয়র্কের বিশাল বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজ।
কখনো সংবর্ধনা, কখনো প্রতিবাদ, কখনো রাজনৈতিক সভা। জাতিসংঘের ভেতরের কূটনীতি এবং বাইরে প্রবাসী বাংলাদেশের রাজনীতি যেন পাশাপাশি চলে। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমাকে দুটো পৃথিবীকেই দেখতে হয়েছে।
জাতিসংঘ বদলেছে, সাংবাদিকতাও বদলেছে
২০০১ সালের সাংবাদিকতা আর ২০২৬ সালের সাংবাদিকতা এক নয়। একসময় একটি সংবাদ সংগ্রহ করে লিখে ঢাকায় পাঠানোই ছিল প্রধান কাজ। এখন সংবাদ ঘটার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। লাইভ ভিডিও, মোবাইল সাংবাদিকতা, অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক মাধ্যম সংবাদ পরিবেশনের গতি আমূল বদলে দিয়েছে।
আগে সাংবাদিকের হাতে সময় ছিল। এখন প্রতিযোগিতা সেকেন্ডের। কিন্তু এই গতির মধ্যে একটি বিপদও তৈরি হয়েছে—যাচাই না করেই সংবাদ প্রকাশের প্রবণতা।
পঁচিশ বছরের জাতিসংঘ সাংবাদিকতা আমাকে একটি বিষয় শিখিয়েছে: সবার আগে সংবাদ দেওয়ার চেয়ে সঠিক সংবাদ দেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের মতো জায়গায় একটি ভুল শব্দও কূটনৈতিক অর্থ বদলে দিতে পারে। একটি ভুল উদ্ধৃতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রযুক্তি যতই বদলাক, সাংবাদিকতার মূলনীতি বদলাতে পারে না—তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।
প্রেস পাস নয়, এটি একটি দায়িত্ব
বাংলাদেশে থাকাকালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ পাওয়ার জন্য সাংবাদিকদের মধ্যে প্রবল আগ্রহ দেখেছি। এখনও প্রতিবছর ঢাকা থেকে অনেক সাংবাদিক নিউ ইয়র্কে আসেন।
তবে এর আরেকটি বাস্তবতাও আমার চোখের সামনে রয়েছে। কেউ কেউ জাতিসংঘের অধিবেশন কাভার করতে এসে আর দেশে ফিরে যাননি। তাঁদের মধ্যে কেউ যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, কেউ নিউ ইয়র্কের বাংলা সংবাদমাধ্যম বা আইপি টিভিতে যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পেছনে নানা বাস্তবতা থাকতে পারে। সেটি বিচার করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু আমার কাছে জাতিসংঘের প্রেস পরিচয়পত্র কখনো শুধুই নিউ ইয়র্কে প্রবেশের একটি সুযোগ ছিল না। এটি ছিল সাংবাদিকতার একটি দায়িত্ব।
এই বিশ্বসভায় প্রবেশের সুযোগ পাওয়া মানে নিজের দেশের পাঠকের চোখ ও কান হয়ে সেখানে উপস্থিত থাকা।
পঁচিশ বছর পরে দাঁড়িয়ে
২০০১ থেকে ২০২৬—পঁচিশ বছর। সংখ্যাটি লিখতে যতটা সহজ, পথটি ততটা সহজ ছিল না। কত সেপ্টেম্বর এসেছে, কত সেপ্টেম্বর চলে গেছে। কত রাষ্ট্রনেতার ভাষণ শুনেছি। কত সংবাদ সম্মেলনের জন্য অপেক্ষা করেছি। কতবার নিরাপত্তা বেষ্টনীর সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি। কত রাত না ঘুমিয়ে সংবাদ লিখেছি। কতবার ম্যানহাটনের আলো পেছনে ফেলে মধ্যরাতে জ্যাকসন হাইটসে ফিরেছি। কখনো গাড়িতে ঘুমিয়েছি। কখনো বন্ধুর বেসমেন্টে। কখনো রান্নাঘরের পাশের সোফায়।
তারপরও পরদিন সকালে আবার জাতিসংঘে গেছি।
কেন?
কারণ সাংবাদিকতা আমার কাছে শুধু পেশা ছিল না। এটি ছিল এক ধরনের নেশা, দায়িত্ব এবং ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। দিনাজপুরের মফস্বল শহরে সাংবাদিকতা শুরু করা সেই তরুণটি যদি ১৯৮৫ সালে আমাকে প্রশ্ন করত—'একদিন কি তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সভার সংবাদ টানা পঁচিশ বছর লিখবে?
আমি হয়তো হেসে বলতাম, 'এও কি সম্ভব? আজ বলতে পারি—সম্ভব হয়েছে।
বিশ্বসভা চলবে, সাংবাদিকের পথও চলবে
জাতিসংঘ নিখুঁত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো, ভেটো ক্ষমতা এবং বড় শক্তিগুলোর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। বিশ্বের বহু যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয় থামাতে সংস্থাটি প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি—এ অভিযোগও নতুন নয়।
তারপরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়—জাতিসংঘ না থাকলে পৃথিবীর প্রায় সব দেশ একই ছাদের নিচে কোথায় বসত?
যুদ্ধরত দেশের প্রতিনিধিরাও কোথায় একই কক্ষে দাঁড়িয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতেন? ছোট দেশগুলো কোথায় বিশ্বের সামনে নিজেদের কথা বলত?
এই কারণেই নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত বহুপাক্ষিক মঞ্চগুলোর একটি।
আর আমার কাছে?
ইস্ট রিভারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাচের সেই ভবনটি আমার সাংবাদিক জীবনের পঁচিশ বছরের নীরব সাক্ষী।
দিনাজপুর থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্ক, আর নিউ ইয়র্ক থেকে জাতিসংঘ—এই দীর্ঘ যাত্রায় আমি রাষ্ট্রনায়ক হইনি, কূটনীতিকও নই। আমি শুধু একজন সংবাদকর্মী। হাতে কলম, গলায় প্রেস পরিচয়পত্র আর মনে সংবাদ খোঁজার অদম্য আগ্রহ নিয়ে ইতিহাসের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি।
পঁচিশ বছর পর আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এটুকুই—আমি বিশ্বকে বদলাতে পারিনি, কিন্তু বিশ্ব যখন একই ছাদের নিচে বসে কথা বলেছে, তখন একজন সাংবাদিক হিসেবে সেখানে উপস্থিত থেকে সেই সময়ের কথা আমার পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি। এটাই আমার সৌভাগ্য। এটাই আমার সাংবাদিক জীবনের এক অমূল্য অধ্যায়।
ছাবেদ সাথী যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি