২৮ আগস্ট ২০২৬

শিকাগো থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস

ফোবানার সঙ্গে আমার তিন দশকেরও বেশি পথচলা

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৯ পিএম
ফোবানার সঙ্গে আমার তিন দশকেরও বেশি পথচলা

নির্বাহী সচিব, ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা (ফোবানা)

খালেদ আহমেদ রউফ
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। বদলে যায় শহর, মানুষ, প্রযুক্তি, যোগাযোগের মাধ্যম—এমনকি একটি সংগঠনের কর্মপরিধি ও স্বপ্নও। কিন্তু কিছু স্মৃতি সময়ের স্রোতে মুছে যায় না। বরং যত দিন যায়, সেগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
আমার কাছে ফোবানা তেমনই একটি নাম—যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিন দশকেরও বেশি সময়ের স্মৃতি, ভালোবাসা, আবেগ, বন্ধুত্ব এবং প্রবাসে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা।
আজকের ফোবানাকে দেখলে অনেকের হয়তো কল্পনা করাও কঠিন, আমাদের সময়ে সম্মেলনের খবর কীভাবে জানতে হতো। তখন ছিল না আজকের মতো ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার ডিজিটাল মাধ্যম।
সেই সময় ফোবানা সম্মেলন ছিল মাত্র দুই দিনের। আর সম্মেলন কোথায় হচ্ছে, কারা আসছেন কিংবা কী কর্মসূচি থাকছে—এসব জানার অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকাগুলোর বিজ্ঞাপন।
শিকাগোতে প্রথম ফোবানা
সেই পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখেই ১৯৯২ সালে শিকাগোতে অনুষ্ঠিত ফোবানা সম্মেলনে প্রথমবারের মতো যোগ দিয়েছিলাম। সেদিন কি জানতাম, একটি বিজ্ঞাপন দেখে একটি সম্মেলনে যাওয়ার সেই সিদ্ধান্তই আমাকে ফোবানার সঙ্গে তিন দশকেরও বেশি দীর্ঘ পথচলায় যুক্ত করে দেবে?
শিকাগোর সেই সম্মেলনের অনেক স্মৃতি আজও মনে পড়ে। প্রবাসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশিরা একটি ছাদের নিচে মিলিত হচ্ছেন, বাংলা ভাষায় কথা বলছেন, গান শুনছেন, সংস্কৃতি উদযাপন করছেন—আমার কাছে সেটি ছিল অন্যরকম এক অনুভূতি। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যেন কিছুক্ষণের জন্য বাংলাদেশকে খুঁজে পেয়েছিলাম। সেখান থেকেই আমার ফোবানা-যাত্রার শুরু।
তারপর কত বছর পেরিয়ে গেল। কত শহরে সম্মেলন হলো, কত নতুন মুখ এল, কত নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটল। সময়ের সঙ্গে ফোবানার পরিধিও অনেক বড় হয়েছে। দুই দিনের ছোট্ট সম্মেলন থেকে এটি আজ উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
আর সেই দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে আমিও ধীরে ধীরে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছি।
দর্শক থেকে সাংগঠনিক দায়িত্বে
একসময় যে ফোবানা সম্মেলনে একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে গিয়েছিলাম, সময়ের ব্যবধানে সেই সংগঠনের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাওয়া আমার জীবনের বিশেষ এক অধ্যায়।
গত দুই বছর আমি ফোবানার নির্বাহী কমিটির যুগ্ম নির্বাহী সচিব হিসেবে কাজ করেছি। সেই সময় সংগঠনের ভেতরের কার্যক্রম আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। উপলব্ধি করেছি—একটি সফল সম্মেলনের তিন দিনের আলোকোজ্জ্বল মঞ্চের পেছনে কত মানুষের মাসের পর মাস শ্রম, পরিকল্পনা, ত্যাগ ও নির্ঘুম রাত লুকিয়ে থাকে।
আজ আমি ফোবানার নির্বাহী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিতব্য ৪০তম ফোবানা সম্মেলন সফল করার লক্ষ্যে একটি বিশাল টিমের সঙ্গে পুরোদমে কাজ করছি।
এই দায়িত্ব আমার কাছে শুধু একটি সাংগঠনিক পদ নয়। ১৯৯২ সালের সেই প্রথম সম্মেলন থেকে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানোর দীর্ঘ যাত্রার দিকে তাকালে এটি আমার জন্য একই সঙ্গে সম্মান, আবেগ এবং বিরাট দায়িত্বের বিষয়।
এবারের গন্তব্য লস অ্যাঞ্জেলেস
৪০তম ফোবানা সম্মেলনের আয়োজক বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া (BAC)। আয়োজক সংগঠন ও ফোবানা নির্বাহী কমিটি একসঙ্গে কাজ করছে একটি স্মরণীয় সম্মেলন উপহার দেওয়ার জন্য।
বিভিন্ন উপকমিটির শতাধিক সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক দিনরাত কাজ করছেন। কেউ অনুষ্ঠান পরিকল্পনায়, কেউ সাংস্কৃতিক আয়োজনে, কেউ অতিথি ব্যবস্থাপনায়, আবার কেউ প্রচার, যোগাযোগ কিংবা অন্যান্য সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কাছ থেকে দেখলে একটি বিষয় বারবার মনে হয়—ফোবানা কোনো একজন মানুষের সংগঠন নয়। এটি অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত শ্রম, মেধা ও ভালোবাসার ফসল।
আমাদের লক্ষ্য, ৪০তম সম্মেলন যেন কেবল আরেকটি বার্ষিক সম্মেলন হয়ে না থাকে; এটি যেন ফোবানার চার দশকের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে ওঠে।
সেই চিন্তা থেকেই এবারের ভেন্যু নির্বাচনেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব পর্যটনের কেন্দ্রে ফোবানা
লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সাল সিটি বিশ্ব বিনোদন শিল্পের অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র। ইতিহাস, আধুনিক বিনোদন ও পর্যটনের এক অসাধারণ সমন্বয় রয়েছে এখানে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক এই এলাকায় আসেন। এই আন্তর্জাতিক পরিবেশের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে আমাদের ৪০তম ফোবানা সম্মেলন।
সম্মেলনে আসা অতিথিরা ফোবানার অনুষ্ঠান উপভোগের পাশাপাশি কাছেই অবস্থিত ইউনিভার্সাল স্টুডিওস হলিউড, বিখ্যাত স্টুডিও ট্যুর, দ্য উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ড অব হ্যারি পটার এবং ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস-এর মতো জনপ্রিয় আকর্ষণ উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
আমরা চাই, এবারের সম্মেলন মানুষ শুধু একটি অনুষ্ঠান হিসেবে মনে না রাখুক; তারা যেন একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা নিয়ে ঘরে ফেরেন।
বদলেছে মাধ্যম, বদলায়নি আবেগ
১৯৯২ সালের কথা ভাবি। একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় ছোট্ট একটি বিজ্ঞাপন দেখে আমি শিকাগোর ফোবানা সম্মেলনের খবর পেয়েছিলাম। আজ একটি ঘোষণা প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের মোবাইল ফোনে পৌঁছে যায়। ফোবানার খবর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদপত্র, ভিডিও এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে।
সময় কত বদলে গেছে!
কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি—ফোবানাকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবেগ। আজও মানুষ বহু দূর থেকে পরিবার নিয়ে সম্মেলনে আসেন। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেন। নতুন প্রজন্মকে বাংলা গান, নাচ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কয়েকটি দিনের জন্য হলেও সবাই ফিরে যান নিজের শিকড়ের কাছে।
আমার কাছে এটাই ফোবানার সবচেয়ে বড় অর্জন।
আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চাই ফোবানাকে
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ফোবানার পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখেছি। অতীতের অর্জন যেমন আছে, তেমনি ভুল ও সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একটি জীবন্ত সংগঠনের ক্ষেত্রে সেটিই স্বাভাবিক। আমাদের কাজ হওয়া উচিত অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
আমি এমন একটি ফোবানা দেখতে চাই, যেখানে প্রবীণদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় ঘটবে। যেখানে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড় হবে, পদ-পদবির চেয়ে কমিউনিটির স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ হবে এবং মতের ভিন্নতা থাকলেও আমাদের ঐক্যের ভিত্তি অটুট থাকবে।
কারণ নেতৃত্ব পরিবর্তিত হবে, সময় পরিবর্তিত হবে, সম্মেলনের শহরও পরিবর্তিত হবে—কিন্তু ফোবানা থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন ১৯৯২ সালের শিকাগোর সেই সম্মেলন আর ২০২৬ সালের লস অ্যাঞ্জেলেসের ৪০তম সম্মেলনের মাঝখানে দেখতে পাই এক দীর্ঘ পথ। 
সেদিন আমি ছিলাম একজন আগ্রহী অংশগ্রহণকারী। আজ আমি নির্বাহী সচিব।
এই দুই পরিচয়ের মাঝখানে রয়েছে তিন দশকেরও বেশি স্মৃতি, অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা এবং ফোবানার সঙ্গে এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক।
শিকাগোতে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তার গন্তব্য লস অ্যাঞ্জেলেস—কিন্তু পথচলা এখানেই শেষ নয়।
আমার প্রত্যাশা, ৪০তম সম্মেলন ফোবানার অতীতের অর্জনকে সম্মান জানিয়ে আগামী দিনের জন্য নতুন একটি দরজা খুলে দেবে। এমন একটি ফোবানা আমরা আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চাই, যা হবে আরও ঐক্যবদ্ধ, আরও শক্তিশালী এবং উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের এক স্থায়ী ঠিকানা। কারণ আমার কাছে ফোবানা শুধু একটি সম্মেলন নয়—এটি প্রবাসে বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রা।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি