২৬ আগস্ট ২০২৬

ফোবানার ছাব্বিশ বছরের স্মৃতিময় সুখ-দুঃখ

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১২ এএম
ফোবানার ছাব্বিশ বছরের স্মৃতিময় সুখ-দুঃখ

ক্যালেন্ডার বলছে—
ছাব্বিশ বছর।
আমি বলি—
এত সহজে কি সময়ের হিসাব হয়?

সময় তো শুধু বছর নয়,
কিছু মুখ, কিছু মঞ্চ,
কিছু করতালি, কিছু দীর্ঘশ্বাস,
কিছু মধ্যরাতের সংবাদ,
আর ক্যামেরায় আটকে থাকা
হাজারো মানুষের ফিরে দেখা স্বদেশ।

দুই হাজার সালের এক সন্ধ্যায়
ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের দরজায়
আমি দাঁড়িয়েছিলাম—
হাতে নোটবুক,
কাঁধে ক্যামেরা,
চোখে তরুণ সাংবাদিকের অদম্য কৌতূহল।

জানতাম না—
সেই একটি দরজা পেরিয়ে
আমি ঢুকে পড়ছি
ছাব্বিশ বছরের এক দীর্ঘ গল্পে।

তারপর—

শহর বদলেছে,
মঞ্চ বদলেছে,
নেতৃত্ব বদলেছে,
নামফলকের পাশে বদলেছে কত নাম;
শুধু বদলায়নি
হাজার মাইল দূরে থাকা মানুষের
বাংলাদেশ নামের ব্যাকুলতা।

ফোবানা—

তুমি কি শুধুই তিন দিনের সম্মেলন?

না।

তুমি প্রবাসী শিশুর মুখে
ভাঙা ভাঙা বাংলা উচ্চারণ,
তুমি রবীন্দ্রনাথের সুরে
ফিরে পাওয়া এক বিকেলের শান্তি,
তুমি নজরুলের বিদ্রোহী উচ্চারণ,
তুমি লাল-সবুজ পতাকায়
অজান্তে ভিজে ওঠা দুটি চোখ।

তুমি মায়ের রান্নার হারানো ঘ্রাণ,
পুরোনো বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলা—
“কত বছর পর!”

তুমি বিদেশের মাটিতে
এক টুকরো বাংলাদেশ।

তবু সব দিন উৎসব ছিল না।

করতালির পাশেই শুনেছি
মতবিরোধের কঠিন শব্দ,
আলোর মঞ্চের পেছনে দেখেছি
অভিমানের দীর্ঘ ছায়া।

কখনো মানুষ কাছে এসেছে,
কখনো মানুষই
মানুষের মাঝখানে দেয়াল তুলেছে।

আমি তখন সাংবাদিক—

আমার হাতে ফুল ছিল না,
ছিল কলম।

কারও প্রশংসা লিখেছি,
কারও সামনে রেখেছি প্রশ্ন;
কারণ সত্যকে ভালোবাসলে
সব সময় জনপ্রিয় থাকা যায় না।

কখনো আমার শব্দে
কেউ আহত হয়েছে,
কখনো সেই শব্দই
কারও নীরব কণ্ঠকে দিয়েছে ভাষা।

আমি শুধু বিশ্বাস করেছি—

সমালোচনা শত্রুতা নয়,
সত্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিপক্ষ নয়;
আয়নাকে ভেঙে দিলে
মুখের দাগ মুছে যায় না।

তারপর পৃথিবী থেমে গেল।

কোভিডের নিঃশব্দ অন্ধকারে
মানুষ যখন মানুষকে ছুঁতে ভয় পায়,
সম্মেলনের আলো নিভে যায়,
দূরত্ব হয়ে ওঠে জীবনের নিয়ম—

তখন ফোবানার আকাশেও
জমেছিল অনিশ্চয়তার মেঘ।

নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন,
ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়,
পথ নিয়ে দ্বিধা—

আমি নীরব থাকিনি।

সেই সময়
কলম ছিল আমার শক্তি,
তথ্য ছিল আমার ঢাল,
আর সত্য—

আমার একমাত্র সাহস।

ছাব্বিশ বছরে
কত মানুষ এলেন,
কত মানুষ চলে গেলেন।

কেউ মঞ্চ থেকে নেমেছেন,
কেউ পৃথিবী থেকেই।

তবু ইতিহাসের একটি আশ্চর্য নিয়ম আছে—
মানুষ চলে যায়,
মানুষের কাজ থেকে যায়।

আজ নতুন মুখ দেখি,
নতুন প্রজন্ম দেখি,
তাদের চোখে অন্য পৃথিবী,
হাতে নতুন প্রযুক্তি,
মনে নতুন প্রশ্ন।

আমি তাদের মধ্যেই দেখি
আগামী দিনের ফোবানা।

আমি স্বপ্ন দেখি—

প্রবীণের অভিজ্ঞ হাত
তরুণের স্বপ্নকে থামাবে না,
বরং তুলে দেবে
আরও উঁচু আকাশে।

নারীর নেতৃত্ব
আর ব্যতিক্রমের গল্প হবে না,
হবে স্বাভাবিক ইতিহাস।

প্রযুক্তি আনবে স্বচ্ছতা,
মতভেদ জন্ম দেবে নতুন চিন্তার—
বিভেদের নয়।

কারণ—

নেতৃত্ব ক্ষণস্থায়ী,
পদ ক্ষণস্থায়ী,
অভিমানও ক্ষণস্থায়ী;
শুধু প্রতিষ্ঠান
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে
বয়ে নিয়ে যায় মানুষের স্বপ্ন।

এবার পথ যাচ্ছে লস অ্যাঞ্জেলেসে।

চার দশকের ফোবানা
নতুন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে।

আমি চাই সেখানে
প্রতিযোগিতা থাকুক—প্রতিহিংসা নয়,
ভিন্নমত থাকুক—বিভেদ নয়,
প্রশ্ন থাকুক—অসম্মান নয়।

থাকুক হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সাহস,
ভুল থেকে শেখার উদারতা,
আর একসঙ্গে উচ্চারণ করার শক্তি—

আমরা বাংলাদেশি।

পেছনে তাকাই—

ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন
এখন যেন বহু দূরের এক আলোকচিত্র।

তবু স্পষ্ট দেখি
সেই তরুণ সংবাদকর্মীকে—
হাতে নোটবুক,
কাঁধে ক্যামেরা,
চোখে বিস্ময়।

আজ তার চুলে সময়ের ছোঁয়া,
নোটবুকের অনেক পাতা শেষ,
ক্যামেরাও বদলেছে বহুবার—

কিন্তু একটি জিনিস বদলায়নি:

বাংলাদেশকে ভালোবাসার
সেই পুরোনো ব্যাকুলতা।

তাই আজও লিখি,
আজও প্রশ্ন করি,
আজও পাশে দাঁড়াই।

সুখের দিনে
করতালির ভেতর,

দুঃখের দিনে
নিঃশব্দ করিডোরে,

সাফল্যে, সংকটে,
ঐক্যে, মতভেদে—

আমি ছিলাম।

আমি আছি।

যতদিন সত্য বলার মতো শব্দ থাকবে,
যতদিন প্রবাসের কোনো শিশুর মুখে
একটি বাংলা শব্দ বেঁচে থাকবে,
যতদিন লাল-সবুজ পতাকা দেখে
কারও বুকের ভেতর বাংলাদেশ জেগে উঠবে—

ততদিন এই পথ শেষ হবে না।

কারণ ফোবানা
শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়—

এ এক দূরদেশে স্বদেশ খোঁজার নাম,
এ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে
বাংলাদেশ পৌঁছে দেওয়ার নাম।

আর আমার কাছে—

ফোবানা মানে
ছাব্বিশ বছরের সুখ-দুঃখ,
ছাব্বিশ বছরের সংবাদ ও স্মৃতি,
ছাব্বিশ বছরের প্রশ্ন ও ভালোবাসা—

একটি দীর্ঘ পথ,
যার শুরু দেখেছি;
শেষ দেখতে চাই না।

 

ছাবেদ সাথী
 

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি