আগাবাড়ি মেস
তৌফিক ইসলাম
আমার নাম তৌফিক। আমি রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর শহরের বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল কম্পিউটার নিয়ে পড়াশোনা করার। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য আমাকে পরিবারের সবার ভালোবাসা ছেড়ে অনেক দূরে, মাগুরায় যেতে হয়েছিল। আমি ২০২২–২০২৩ সেশনে মাগুরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার টেকনোলজিতে ভর্তি হই।
মাগুরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল থাকার জায়গা। শেষ পর্যন্ত আমি উঠলাম একটি পুরোনো ছাত্রাবাসে, যার নাম ছিল আগাবাড়ি মেস।
মেসটি ছিল বেশ পুরোনো। দেয়ালের রং অনেক জায়গায় উঠে গিয়েছিল, করিডোরগুলো ছিল নির্জন, আর রাতে পুরো ভবনটাতে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসত। তবে মেসের সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল এখানকার মানুষগুলো। সিনিয়র ভাইদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। যদিও তারা আমাদের থেকে প্রায় তিন বছরের সিনিয়র ছিলেন, তবুও কখনো আমাদের ছোট মনে করতেন না। পড়াশোনা, ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা বাড়ির কথা—সবকিছু নিয়েই তারা আমাদের পাশে থাকতেন।
আমাদের কলেজে মোট আটটি সেমিস্টার ছিল। সাতটি সেমিস্টারে নিয়মিত ক্লাস এবং শেষ সেমিস্টারটি ছিল ইন্টার্নশিপের জন্য।
প্রথম দিকে সবকিছুই স্বাভাবিক চলছিল। এক রাতে আমরা সবাই একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ এক সিনিয়র ভাই হাসতে হাসতে বললেন,
— "তৌফিক, জানিস তো? এই মেসে নাকি ভূত আছে!"
আমি হেসে বললাম,
— "আরে ভাই, এসব আবার বিশ্বাস করার মতো কথা নাকি?"
তখন আরেকজন ভাই গম্ভীর মুখে বললেন,
— "বিশ্বাস কর বা না কর, কিন্তু রাতের বেলা ছাদে একা যাস না।"
তাদের কথা শুনে তখন খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম, নতুনদের ভয় দেখানোর জন্য হয়তো এসব বলা হচ্ছে।
আমি আর আমার রুমমেট প্রায় প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত ছাদে বসে গল্প করতাম। আমরা দুজনই বাড়ি থেকে অনেক দূরে ছিলাম। তাই গভীর রাতে ছাদের খোলা আকাশের নিচে বসে পরিবারের কথা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর জীবনের নানা গল্প ভাগাভাগি করতাম। সেই সময়গুলো ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সময়।
কিন্তু একদিন এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা আমার জীবনের অন্যতম ভয়ঙ্কর স্মৃতি হয়ে আছে।
সেদিন রাতে আমি পড়ার টেবিলে বসে পড়ছিলাম। হঠাৎ উপরের তলা থেকে প্রচণ্ড দৌড়াদৌড়ি আর চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম।
আমি দ্রুত দরজা খুলে বাইরে বের হলাম।
দেখলাম, একটি রোগা-পাতলা ছেলে দুইজন সিনিয়র ভাইয়ের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। সে বারবার চিৎকার করে বলছিল,
— "আমাকে ছাড়ো! আমাকে ছাড়ো!"
হঠাৎ সে নিজেকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় তলার বারান্দা থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করল। মুহূর্তের মধ্যেই সে নিচে পড়ে গেল।
আমরা সবাই দৌড়ে নিচে নেমে গেলাম। ছেলেটি তখন সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। সবার মুখে আতঙ্ক। কেউ পানি আনছে, কেউ তাকে ডাকছে, কেউ আবার অ্যাম্বুলেন্স ডাকবে কি না তা নিয়ে আলোচনা করছে।
কিছুক্ষণ পর ছেলেটির জ্ঞান ফিরল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে কিছুই মনে করতে পারছিল না। সে শুধু অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে ছিল।
কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল—সে নিজেই বলতে পারছিল না।
সিনিয়র ভাইয়েরা তাকে তার রুমে নিয়ে গেলেন।
সেদিনের পর থেকে আমার মনেও ভয় বাসা বাঁধতে শুরু করল।
রাতে ঘুমাতে গেলে মনে হতো, কেউ যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেত। অনেক সময় মনে হতো, রুমে আমি একা নই।
এর কিছুদিন পর কলেজে ছুটি হলো।
বাড়িতে ফিরে গেলেও আমি কাউকে কিছু বলিনি। কিন্তু মা বুঝতে পারছিলেন, আমি আগের মতো নেই।
একদিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— "কী হয়েছে? তোকে এত চুপচাপ লাগছে কেন?"
আমি কিছু না বললেও, পরে নানার কাছে পুরো ঘটনাটি খুলে বললাম।
নানা আমাকে সাহস দিলেন, কিছু দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করলেন এবং বললেন,
— "ভয়কে কখনো মনে জায়গা দিবি না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ।"
তার কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম।
ছুটি শেষ হলে আবার মাগুরায় ফিরে এলাম।
ততদিনে আমাদের প্রিয় সিনিয়র ভাইদের পড়াশোনা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারা সবাই মেস ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
তাদের বিদায় উপলক্ষে আমরা সবাই মিলে একটি ছোট অনুষ্ঠান আয়োজন করলাম।
হাসি-আনন্দের মাঝেও সবার চোখে ছিল বিদায়ের কষ্ট।
ভাইদের চলে যাওয়ার পর পুরো মেসটাই যেন বদলে গেল।
আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য আর ছিল না। করিডোরগুলো আরও নির্জন লাগত, আর রাতগুলো যেন আরও বেশি নীরব হয়ে উঠেছিল।
কিছুদিন পরে আমি রুম পরিবর্তন করে পাশের একটি বেলকনিযুক্ত রুমে উঠে গেলাম।
বেলকনিতে বসে রাত জেগে পড়াশোনা করা আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।
এক রাতে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে পড়ছিলাম।
হঠাৎ চোখ চলে গেল মেসের পাশের একটি বড় গাছের দিকে।
দেখলাম, গাছের মাথায় সাদা কাপড়ের মতো একটি অবয়ব বসে আছে।
আমি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
এরপর মুহূর্তের মধ্যেই সেটি যেন অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমার পুরো শরীর কাঁপতে শুরু করল।
কোনো দিকে না তাকিয়ে দৌড়ে রুমের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
সারা রাত আর ঘুমাতে পারিনি।
আজও জানি না, সেদিন আমি আসলে কী দেখেছিলাম।
হয়তো সেটা ছিল চোখের ভুল, হয়তো আলো-ছায়ার খেলা, অথবা এমন কিছু যার ব্যাখ্যা আজও আমার জানা নেই।
এর কিছুদিন পর আমি মাগুরা পলিটেকনিক থেকে ট্রান্সফার নিয়ে দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হই।
নতুন জায়গায় নতুন জীবন শুরু হলেও, মাগুরার সেই আগাবাড়ি মেসের স্মৃতিগুলো কখনো ভুলতে পারিনি।
আজও "আগাবাড়ি মেস" নামটি শুনলেই সেই নির্জন রাত, ছাদের আড্ডা, সিনিয়র ভাইদের হাসি, আর সেই রহস্যময় ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
বিপি/টিআই
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
জীবন, প্রকৃতি ও অস্তিত্বের ভাষায় মোহাম্মদ আশিকুর রহমানের চারটি কবিতা
সঙ্গীত একাডেমি