মতামত
এখন সব জামাতীরাই কি বিএনপি হয়ে গেছে
মেজর রেজাউর রহমান (অব:)
ঘুম থেকে উঠেই ভাবছিলাম, যে প্রোফাইল পিকচারটা ফেসবুকে ১৭ মাস ধারন করে আছি, সেটা পরিবর্তন করে ফেলবো, আইডি মেটা ভেরিফাইড হওয়াতে বেশ সময় নিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে কেন চেঞ্জ করলাম? আমি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী নই, কিন্তু দেশ বিদেশের কোটি জনতার মত আমিও ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলাম, এখনও করি। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি নির্বাচনী কৌশলগত কারণে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন ও অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে তবে হয়তোবা আমার সমর্থন ফিরিয়ে নেবো।
আমি রাজনীতি নিয়ে কখনো ইন পাবলিক লিখিনা বা কথা বলিনা, তবে সবসময় রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতন, জানার চেষ্টা করি। আমি মনে করি রাজনিতীবিদেরই রাজনীতি করা উচিৎ এবং নতুন বা তরুণদের জায়গা করে দেওয়া উচিত। কিন্তু আজ একটু লিখছি বা লিখতে হচ্ছে। একটা ব্যপার সবার পরিস্কার বোঝা উচিত কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শ আর নির্বাচনের কৌশল হিসাবে জোট গঠন, মোটেই এক কথা নয়। আমি জানি সবচেয়ে বেশি কথা হচ্ছে এনসিপি কেন জামাতের সাথে জোটে গেল? আসেন আমার জায়গা বা জ্ঞান থেকে বলার চেষ্টা করি, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত।
জামাত ইসলামী এদেশের স্বাধীনতা বিরোধী একটা শক্তি একথা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি এটাও সত্য যে আওয়ামীলীগও নির্বাচনের কৌশল হিসেবে গোলাম আযমের পায়ে ধরে সালাম করে সমর্থন চেয়েছিলো। বিএনপি বহুবার জামায়াতের সাথে নির্বাচনী ঐক্য বা জামাতও সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সাথে জোট করেছে, তাই বলে কি বিএনপি জামাত হয়ে গেছে, নাকি জামাত বিএনপি হয়ে গেছে? ওহ… এনসিপি ছোট বাচ্চাদের দল, চোখে পড়ে না। যাদের পড়ছে ওনারা কিন্তু নাই এদেশে। এধরনের নির্বাচনী জোট গঠন সব কিছুই ইতিহাস এবং অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই, কিন্তু যাঁদের হাতে অজস্র সময় আছে তারা ট্রল নিয়ে ব্যস্ত।
তারেক রহমান দেশে ফেরার পর ভোটের মাঠের চেহারা টোটালি বদলে গেছে। দেশে এখন পরিষ্কার দুটো দলের ধারা, একটা BNP অন্যদিকে জামায়াত। আওয়ামী লীগ দল আছে লোক নাই, তারা অন্য দেশে। জাতীয় পার্টি কি অবস্থায় কোথায় আছে বলা মুশকিল। ভোটের মাঠে নির্বাচনী জোট না করলে ছোট কোন দলের প্রার্থীদের জয়ী হয়ে আসা অসম্ভব। আর প্রার্থী না জিতলে দলের অস্তিত্ব থাকবে কিনা সন্দেহ!
বিএনপি ছাত্রদের এনসিপি’র জন্য ৪/৫ টার বেশি আসন দেওয়া সম্ভব ছিল কিনা জানি না। দীর্ঘদিনের স্হানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে এখন বিএনপি যদি এনসিপিকে তাদের দাবি অনুযায়ী ৩০/৪০ টা সিট দিতে হয় তাহলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ভিড়ে বিএনপি’র অস্তিত্ব টেকা দায় হয়ে দাঁড়াতে পারতো। এনসিপি একক নির্বাচনে গেলে কতজন জিতে আসতে পারবে সন্দেহ। আর জিতে না আসতে পারলে নতুন গড়া পার্টির অস্তিত্ব থাকবে কি না সেটাও অনিশ্চিত। তাহলে তাদের জন্য এ মুহুর্তে পথ খোলা একটাই, সেটা হলো জামায়াত। আগেই বলেছিলাম তারেক রহমান দেশে ফেরার পর রাজনীতির ম্যাপ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এন্সিপি কিন্তু একক নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল। মনে রাখবেন প্রথমদিকে আওয়ামীলীগের ব্যপারে যখন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি তখন জামায়াত কিন্তু বিএনপি থেকে ১০০ সিট চেয়েছিল। অবাক হওয়ার কিছু নাই যদি কোনদিন দেখেন আওয়ামী লীগ আর বিএনপি জোট হয়ে ইলেকশন করছে! রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আপনারা অবাক হন নাই, যখন শুনেছেন খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য কেউ দোয়া করে?
অনেকেই মনে করে বর্ষা বিপ্লবে জামায়াত ইসলামের বড় ভূমিকা ছিল। আমি বলবো কথা সত্য। আওয়ামীলীগের বয়ান অনুযায়ী যারা ঐ আন্দোলনে ছিল সবাই জামাতী। আবু সাইয়ীদকে দিনের আলোয় গুলি করে মারার পর আমিও ঘরে বসে চুপ করে থাকিনি। প্রকাশ্যে ডালাসের তিনটি জায়গায় ব্যনার ফেস্টুন নিয়ে ফ্যাসীবাদ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের সাপোর্ট করেছি। এখন ঐ বর্ষা বিপ্লবকে সমর্থন করলে কেউ যদি জামাতি হয়, তাহলে আমিও জামাত। ১৪০০ ছাত্র জনতা যারা মারা গেছে সবাই জামাত, ২৫ হাজার আহত সবাই জামাত, ৬ বছরের শিশুও জামাত। আওয়ামী লীগ ব্যতীত যতগুলো দল দেশে আছে সবাই জামাত। সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ভাই-বোন যারাই বর্ষা বিপ্লব সমর্থন দিয়েছে সবাই জামাত, ডালাসে আমিও যাদের আন্দোলনে দেখেছি তাহলে তারাও সবাই জামাত! আরে জামাত যদি এত শক্তিশালীই হতো তাহলে গত ১৭ বছরে কি ছিড়ছে? কিসের কি ইলেকশন ফিলেকশন, ডাঃ শফিকুর রহমান ৫ই আগস্ট বিকালে বলা উচিত ছিলো আমিই আজকে থেকে এদেশের প্রধানমন্ত্রী, এই আমার মন্ত্রিসভা, আগে বাড়েন। এত সোজা না! বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আমাদের সন্তানতুল্য ছেলেমেয়েগুলো জগদ্দল পাথরের মতো বসে থাকা স্বৈরাচারকে তাড়িয়েছে। ওদের রক্তের সাথে কারো বেইমানী করা ঠিক না।
আজ আমাকে বাসায় বলা হলো, কে নাকি তাকে বলেছে আমি নাকি বিএনপি, কিন্তু বলি না কেন? আমার উত্তর ছিল খুব পরিষ্কার, আমাকে যদি ভোট দিয়ে বলা হয়, আমি এখন বিএনপিকে ভোট দেবো, যদি দেখি শুধু জামাত আর আওয়ামীলীগ ইলেকশন করছে, আওয়ামীলীগকে ভোট দেবো। যদি কোনদিন দেখি আওয়ামিলীগ, জামায়াত, বিএনপি এবং এনসিপি ইলেকশন করছে আমি এনসিপিকে ভোট দেবো। কি বুঝলেন? মজার ব্যপারকি আমার জীবনে কোন জাতীয় ইলেকশনে ভোট দেওয়ার সুযোগ হয় নাই। যখনই কোন জাতীয় ইলেকশন, আমাকে ইলেকশন ডিউটির সেনাবাহিনী ডেপ্লয়মেন্টে যেতে হয়েছে। ১৯৯০ সালে এরশাদ আমলে আমি তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের দিঘীনালায়, উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে নির্বাচনী ডিউটির সেকেন্ড হাফে আমাদের বলা হলো কেউ ভোট দিতে চাইলে দিয়ে আসতে পারি। আমি জাতীয় পার্টির পাহাড়ি এক প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলাম। ওটাই আমার জীবনে একমাত্র ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এবার পোস্টাল ব্যালটে রেজিস্ট্রেশন করেছি, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ভোট দিয়ে এক্সাইটেড।
শেষ করার আগে আমি একটা কথা বলতে চাই, সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত যারা খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে ট্রল করেছেন, বলেছেন অনেক আগেই ‘নাই’ শুধু ১৬ই ডিসেম্বর ডিক্লেয়ার করা বাকী, নিথর দেহ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে নিতে চায় নাই, ইত্যাদি ইত্যাদি। বলতে চাই আপনার জীবনেও কিন্তু এমন কিছু আসতে পারে, টেরও পাবেন না। আমাদের আপনাদের বেলায় ট্রল অনেক দুরের কথা, নিজের ঘরের লোক ছাড়া দোয়া করারও কেউ থাকবে না। খালেদা জিয়া এমন এক জায়গায় পৌছেছেন, শুধু বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা নয়, শত্রুরাও তার জন্য দোয়া করে, আমরা একটু রুচির পরিচয় দেই প্লিজ…।
শুরু করেছিলাম এনসিপির কথা নিয়ে, জামাত এদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ভাল কথা, এনসিপি জামাতের সাথে নির্বাচনী জোট করেছে তাই তারা জামাত হয়ে গেছে, খুব সুন্দর! ওদের জন্মতো হয়েছে মাত্র ১০ মাস আগে, আমাকে একটা কথা বোঝান তো; এলডিপি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, কর্নেল অলি রনাঙ্গনের খেতাব প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধু ওনাকে বীরবিক্রম উপাধি দিলেন, তাহলে কি এলডিপি বা কর্নেল অলিও কি জামাত? নির্বাচনে জোট গঠন আর রাজনৈতিক দর্শন দুটো আলাদা। এনসিপির বেলায় ঐ ঢালাও মন্তব্য প্রিমেচুউর। জামাতও কয়েকমাস আগেই বিএনপি’র সাথে নির্বাচনী জোট করতে চেয়েছিল এবং আগে বহুবার করেছে, কই কাউকে কিন্তু বলতে শুনিনি সব জামায়াত এখন বিএনপি হয়ে গেছে…মজা লন নাহ্…, আওয়াজ নীচে।
মেজর রেজাউর রহমান (অব: লেখক ও সাংস্কৃতিককর্মী যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস প্রবাসী।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি