৪ মে ২০২৬

তাজা ভাবনা

ডাক্তার উপস্থিত থাকলেও রোগী মারা যায়

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ০১ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:০৪ পিএম
ডাক্তার উপস্থিত থাকলেও রোগী মারা যায়

ছাবেদ সাথী

বাংলাদেশের স্কুলজীবনের ইংরেজি পরীক্ষায় একটি প্রশ্ন প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছিল ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেলো’-এর ইংরেজি করো।

এমন কোনো শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়নি। প্রশ্নটি শুধু ব্যাকরণের নয়, এক ধরনের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হিসেবেও আমাদের মনে গেঁথে গেছে।

মজার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা কখনোই এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয় না। কারণ এখানে প্রবাদটি উল্টো-রোগী মরিবার আগেই ডাক্তার আসেন। উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, দ্রুত সাড়া দেওয়া জরুরি সেবা, আধুনিক হাসপাতাল আর একাধিক বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি-সব মিলিয়ে ‘ডাক্তার দেরিতে আসা’র গল্প এখানে বিরল।

কিন্তু সম্প্রতি এক প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে—

ডাক্তার থাকিবার পরেও রোগী মারা গেলো কেমনে?

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর চিকিৎসায় প্রায় ছয়জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োজিত ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়। এরা হলেন- চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন,চিকিৎসক ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ সিদ্দিকী, চিকিৎসক সাহাবুদ্দিন তালুকদার, চিকিৎসক নুরুদ্দিন আহমেদ, চিকিৎসক মোহাম্মদ জাফর ইকবাল ও চিকিৎসক মোহাম্মদ আল মামুন।

আধুনিক হাসপাতাল, অভিজ্ঞ চিকিৎসক, সর্বোচ্চ পরিচর্যা সবকিছু থাকার পরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো গেল না। এখানেই প্রশ্নটি আরও গভীর হয়ে ওঠে।

এই প্রশ্ন আসলে কোনো ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যর্থতার নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সংঘাত নিয়ে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ অনেক দূর এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা এখনো মৃত্যু জয় করতে পারেনি। চিকিৎসা মানুষের জীবন দীর্ঘায়িত করতে পারে, কষ্ট কমাতে পারে, কিন্তু মৃত্যুকে চূড়ান্তভাবে ঠেকাতে পারে না -এই সত্য আমরা প্রায়ই মানতে চাই না।

বিশেষ করে ক্ষমতাধর, প্রভাবশালী বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। আমরা ধরে নিই-সবচেয়ে দামি হাসপাতাল, সবচেয়ে দক্ষ চিকিৎসক, সবচেয়ে উন্নত যন্ত্রপাতি থাকলে মৃত্যু অসম্ভব। কিন্তু মানবদেহ কোনো যন্ত্র নয়, আর জীবন কোনো গণিতের সমীকরণ নয়-যেখানে সব ভেরিয়েবল নিয়ন্ত্রণে থাকলেই ফলাফল নিশ্চিত।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-রাজনীতি ও চিকিৎসা একসঙ্গে এলে বাস্তবতার চেয়ে আবেগ, সন্দেহ আর অভিযোগ দ্রুত ছড়ায়। চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, হাসপাতালের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, কখনো কখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকেও ষড়যন্ত্রের রঙে রাঙানো হয়। এতে লাভ কারও হয় না- না রোগীর, না সমাজের।

‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেলো’ ছিল অব্যবস্থার গল্প। আর ‘ডাক্তার থাকিবার পরেও রোগী মারা গেলো’-এটি আমাদের বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার অক্ষমতার গল্প।

মৃত্যু অনিবার্য-এই নির্মম সত্য উন্নত দেশেও বদলায়নি, বদলায়নি আধুনিক হাসপাতালেও। বরং সভ্যতা যত এগোয়, মানুষের প্রত্যাশা তত বেড়ে যায়। সেই প্রত্যাশার ভার বইতে গিয়েই চিকিৎসাবিজ্ঞানকে কখনো কখনো এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যার উত্তর বিজ্ঞানের নয়-দর্শনের। হয়তো আমাদের নতুন করে শিখতে হবে-সব মৃত্যু ব্যর্থতা নয়, আর সব চিকিৎসা অলৌকিক হতে পারে না।

চিকিৎসা অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা

চিকিৎসা বিজ্ঞান আজ গতির সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি, অ্যান্টিবায়োটিক, অস্ত্রোপচার, জেনেটিক থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি সবই মানুষের জীবনকে দীর্ঘায়িত করার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু আরেক ফরাসি প্রবাদ বলে-‘চিকিৎসা রোগীকে দীর্ঘায়িত করতে পারে, কিন্তু মৃত্যু ঠেকাতে পারে না।’

মৃত্যুর ঘটনায় সর্বদাই প্রশ্ন ওঠে-চিকিৎসা ব্যর্থ হল কি অবহেলাজনিত কারণে?চিকিৎসা সেবাদান কতটা দায়িত্বশীল? আর রোগী কি সঠিকভাবে সুরক্ষিত ছিল? এই তিনটি প্রশ্ন আজকের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

চিকিৎসা অবহেলা

চিকিৎসা অবহেলা সাধারণত তখনই গন্য হয় যখন-চিকিৎসকের ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল চিকিৎসা, রোগ নির্ণয় ভুল হওয়া বা বিলম্ব, জরুরি পরিস্থিতিতে সময়মতো সাড়া না দেওয়া, অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ/পরীক্ষা, চিকিৎসা কর্মীদের অপ্রশিক্ষিত বা অসতর্ক আচরণ, হাসপাতালে অপর্যাপ্ত সহায়তা।এর ফলে রোগীর শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হওয়া, জটিলতা বা মৃত্যু ঘটেছে।

যেমন কোনো ল্যাব রিপোর্ট ভুল হওয়া, ভুল ওষুধ লেখা, আইসিইউতে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকা—এসব যদি চিকিৎসা ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেক্ষেত্রে তা দায়িত্বহীনতা এবং চিকিৎসা অবহেলার অন্তর্ভুক্ত।

চিকিৎসা ব্যর্থতা

এটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ-সব চিকিৎসা ব্যর্থতা চিকিৎসা অবহেলা নয়। এখানে কুসংস্কার ও বাস্তবতার ফ্যান্ডেল খুবই সূক্ষ্ম:

রোগীর শারীরিক অবস্থা অনেক সময় জটিল কিছু রোগ (যেমন: উন্নত ক্যানসার, হৃদরোগ, জটিল সংক্রমণ) চিকিৎসা সত্ত্বেও সুস্থ করা কঠিন। চিকিৎসা বিজ্ঞান নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে কাজ করে-‘সকল রোগের ওষুধ’ নেই। রোগীর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন-এক রোগী একই চিকিৎসায় ভাল সাড়া দেয়, অন্যজন নাও দিতে পারে।

তাই চিকিৎসা ব্যর্থতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘অবহেলা’ বা ‘দায়িত্বহীনতা’ নয় তবে যদি প্রমাণ থাকে চিকিৎসকের ভুল, অবহেলা বা অসতর্কতা চিকিৎসার ফল খারাপ করেছে, তখন সেটা চিকিৎসা অবহেলা।

প্রমাণ ও তদন্ত-সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু

চিকিৎসা অবহেলার দাবিতে সবচেয়ে কঠিন অংশটি হলো-এটা প্রমাণ করা।

এতে প্রয়োজন হয়: মেডিকেল রেকর্ড ও রিপোর্ট, রোগীর রোগের শুরু থেকে চিকিৎসার প্রতিটি পদক্ষেপ, বিশেষজ্ঞদের দলগত মূল্যায়ন ও চিকিৎসকের চিকিৎসা নোট ও সিদ্ধান্তের যুক্তি।

যদি রোগীর মৃত্যু হয়েছে, তার পরেও চিকিৎসা সঠিক ছিল কি না তার পেছনের বিশ্লেষণটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়েছিল কি না? পর্যাপ্ত পরীক্ষা করা হয়েছিল কি? দ্বিতীয় মতামত নেওয়া হয়েছিল কি? এসব প্রশ্নের উত্তর চিকিৎসা ব্যর্থতা বনাম চিকিৎসা অবহেলার দিকটিকে আলাদা করে দেয়।

বাংলাদেশে চিকিৎসা ভুল ও দায়-দায়িত্ব

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় কিছু উল্লেখযোগ্য বাস্তবতা হলো- হাসপাতাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত, রোগীর তথ্য ও পরামর্শ প্রমাণভিত্তিক নাও হতে পারে, অভিজ্ঞতা-ঘাটতি ও বেশি চাপের মধ্যে চিকিৎসক কাজ করেন, রোগী ও পরিবারের চাপ/অপেক্ষার কারণে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, রিসোর্স সীমাবদ্ধতা (বিশেষ করে সরকারি ও বড় হাসপাতালে)

এগুলোতে চিকিৎসা ভুল হয়-কিন্তু ভুল অবহেলা তখনই গন্য হবে যখন চিকিৎসা সঠিক নিয়ম অনুসরণ না করে, প্রমাণিত ভুল সিদ্ধান্তে রোগীকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

দায়িত্বহীনতার সামাজিক ও নৈতিক দিক

চিকিৎসা দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকের কাজ নয়-এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব, যার সঙ্গে যুক্ত:

চিকিৎসক, হাসপাতাল প্রশাসন, নীতি নির্মাতা ও রোগী ও পরিবার।

চিকিৎসা ভুল হলে- রোগী পরিবার মানসিক ও আর্থিক বোঝা নেয়, চিকিৎসা সেবায় অনাস্থা তৈরি হয়, সাধারণ জনগণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারায় এবং সামাজিক মিডিয়ায় ভুল ধারণা ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই নৈতিক দিকগুলোও গুরুত্বপূর্ণ-যা শুধু চিকিৎসা ভুল নয়, সমাজের ওপর এর প্রভাব জানায়।

সমাধান কোথায়?

চিকিৎসা ভুল ও দায়-দায়িত্ব নিয়ে নির্দোষ রোগীর মৃত্যু বা ক্ষতি প্রতিরোধে দরকার:

মেডিকেল ট্রায়াল ও প্র্যাকটিস গাইডলাইন চর্চা, প্রতিটি চিকিৎসা সিদ্ধান্তে গ্রহণ, রোগীর তথ্য-পর্যবেক্ষণ সঠিকভাবে রেকর্ড রাখা, রোগী ও পরিবারকে সঠিকভাবে বোঝানো, স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, রোগীর প্রতি মানবিক আচরণ

এগুলো শুধু চিকিৎসা ভুল কমাবে না-বিশ্বস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াবে।

মৃত্যু কখনোই ব্যর্থতা নয়

সবশেষে মৃত্যুকে চিকিৎসা ভুল বা অবহেলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা উচিত এমনটা নয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞান ইতোমধ্যেই অনেক রোগের মৃত্যু সময় বাড়িয়েছে, জীবনমান উন্নত করেছে—এই সফলতাও ভুলে যাবার নয়।

যা জানা জরুরি- চিকিৎসা ভুল হলে সেটি প্রমাণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত, অন্যথায় এটি রোগীর অদেখা বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো একটি ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে।

ডাক্তার উপস্থিত থাকার পরও রোগী মারা গেলে দায় কার?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে 'ডাক্তার আসিবার আগে রোগী মারা গেল'- এই বাক্যটি আর বাস্তব নয়। আজ রোগীর শয্যার পাশে ডাক্তার থাকেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকে, বিশেষজ্ঞ দল থাকে। তবুও মৃত্যু হয়। প্রশ্ন হলো- এটি অনিবার্য পরিণতি, নাকি চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যর্থতা?

সব মৃত্যু চিকিৎসা অবহেলার ফল নয়। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুই একটি পেশাদার মূল্যায়নের দাবি রাখে। রোগ নির্ণয়ে দেরি, চিকিৎসা সিদ্ধান্তে সমন্বয়ের অভাব, জরুরি পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের সংকট-এসবই আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থায় নীরব ঝুঁকি।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো জবাবদিহির অভাব। গুরুতর মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বাধীন মেডিকেল রিভিউ বোর্ড গঠন, চিকিৎসা নথির স্বচ্ছতা এবং পরিবারকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়ার সংস্কৃতি না থাকলে আস্থা ফিরবে না। চিকিৎসা মানেই শুধু প্রযুক্তি নয় এটি দায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও মানবিকতার সমন্বয়।

ডাক্তার ছিল, তবু রোগী মারা গেল-কেন?

আধুনিক হাসপাতালে একাধিক চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও রোগীর মৃত্যু হলে সেটিকে অটল নিয়তি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রশ্ন তুলতেই হয় সময়মতো সিদ্ধান্ত হয়েছিল কি না, চিকিৎসা পরিকল্পনায় সমন্বয় ছিল কি না, ঝুঁকি আগেই জানানো হয়েছিল কি না।

বাংলাদেশে চিকিৎসা অবহেলা প্রমাণ করা কঠিন নয় বরং তদন্ত করাই কঠিন। কারণ এখানে স্বাধীন তদন্ত কাঠামো দুর্বল। ফলে পরিবার ন্যায়বিচার পায় না, আর ভালো চিকিৎসকরাও একই সঙ্গে সন্দেহের মুখে পড়েন।

চিকিৎসায় ব্যর্থতা হতে পারে, কিন্তু ব্যাখ্যা ছাড়া মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়। রোগী-পরিবারের সঙ্গে সৎ যোগাযোগ, স্বচ্ছ নথি এবং স্বাধীন মূল্যায়ন এই তিনটি ছাড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশ্বাস ফেরানো সম্ভব নয়।

রোগী মারা গেলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

আজ আর কেউ বলতে পারে না ডাক্তার আসেননি। আসেন, থাকেন তবুও রোগী মারা যায়। তখন দায়টা কার?

বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অসুখ হলো-দায়হীনতা। একাধিক চিকিৎসক থাকলে দায় কারও নয়-এই নীরব সংস্কৃতি চলতে পারে না। চিকিৎসা একটি দলগত পেশা ঠিকই, কিন্তু দলগত মানেই দায়হীনতা নয়।

গুরুতর রোগে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে সময়ই জীবন। সিদ্ধান্তে এক ঘণ্টার দেরি, ঝুঁকি লুকানো এক বাক্যের নীরবতা-সবই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

বেগম খালেদা জিয়া'র মতো জাতীয় ব্যক্তিত্বের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আধুনিক হাসপাতাল থাকলেই যথেষ্ট নয়। চাই জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও মানবিক সাহস।

প্রশ্ন তোলা চিকিৎসাবিরোধিতা নয়। প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া-সেটিই প্রকৃত অবহেলা।

চিকিৎসা উপস্থিতি সত্ত্বেও রোগীর মৃত্যু

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগীর মৃত্যুকে আর কেবল 'চিকিৎসক অনুপস্থিত ছিলেন' এই যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। উন্নত হাসপাতাল কাঠামোতে রোগীর শয্যার পাশে চিকিৎসক দল, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট বিদ্যমান থাকে। তবুও যখন মৃত্যু ঘটে, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়-বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের দাবি তৈরি করে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ গুরুতর চিকিৎসা ব্যর্থতা সরাসরি অদক্ষতার ফল নয় বরং তা হয় 'সিস্টেম ব্যর্থতা' বা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, একাধিক চিকিৎসকের মধ্যে দায়িত্ব বিভাজনের অস্পষ্টতা, সমন্বিত চিকিৎসা পরিকল্পনার অভাব এবং জরুরি অবস্থায় নেতৃত্বের অনির্ধারিত কাঠামো

বিশেষ করে যখন একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একটি রোগীর চিকিৎসায় যুক্ত থাকেন, তখন 'সম্মিলিত যত্ন' কার্যকর না হলে তা 'বিস্তৃত দায়িত্ব'-তে রূপ নেয়। অর্থাৎ সবাই জড়িত থাকলেও চূড়ান্ত দায় কেউ বহন করেন না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা অবহেলা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো স্বাধীন মেডিকেল অডিট ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। উন্নত দেশগুলোতে গুরুতর মৃত্যুর পর নিয়মিতভাবে অসুস্থতা এবং মৃত্যুহার পর্যালোচনা পরিচালিত হয়, যেখানে চিকিৎসা সিদ্ধান্তগুলো পেশাদারভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠেনি।

চিকিৎসা নথির স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রোগীর অবস্থা, ঝুঁকি, বিকল্প চিকিৎসা এবং সম্ভাব্য পরিণতি-এসব তথ্য অনেক সময় পরিবারকে পূর্ণাঙ্গভাবে জানানো হয় না। ফলে মৃত্যুর পর আস্থার সংকট তৈরি হয় এবং চিকিৎসা পেশা সামগ্রিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ চিকিৎসা পর্ব এবং পরবর্তী মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয় বরং বাংলাদেশের উচ্চমাত্রার চিকিৎসা ব্যবস্থার কাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে একটি বৃহত্তর আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

কাউকে দোষারোপ করা নয় বরং সংস্কার হওয়া উচিত

এই আলোচনার লক্ষ্য কাউকে অভিযুক্ত করা নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত-চিকিৎসা সিদ্ধান্তে প্রোটোকলভিত্তিক জবাবদিহি, স্বাধীন মেডিকেল রিভিউ বোর্ড গঠন, রোগী ও পরিবারের সঙ্গে তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ যোগাযোগ।

চিকিৎসা বিজ্ঞান কখনও মৃত্যুকে পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। সেই ব্যাখ্যা যত স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক হবে, ততই স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা টেকসই হবে।

শেষ কথা

চিকিৎসা অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা একটি জটিল এবং সংবেদনশীল বিষয়। এটিকে 'ডাক্তার আসেনি' বা 'চিকিৎসা ব্যর্থ হয়েছে'-এই সরল সমীকরণে ফেলা ভুল। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রমাণভিত্তিক, চিকিৎসা নীতি–গাইডলাইন–মানবিক আচরণ–সঠিক যোগাযোগ এসব দিক থেকে বিচার করা উচিত।

দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি করতে হলে দায়িত্বশীল চিকিৎসকের সঙ্গে রোগী–পরিবারের সম্মান, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও মানবিক আচরণ এসব অপরিহার্য।

মৃত্যু চিকিৎসার পরাজয় নয়। কিন্তু অবহেলা হলে তা অপরাধ। বেগম খালেদা জিয়ার মতো জাতীয় ব্যক্তিত্বের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়-প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়, আর প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া আরও বড় অপরাধ।

আজকের বাস্তবতা তাই একটাই প্রশ্ন রেখে যায়- ডাক্তার থাকিবার পরও রোগী মারা গেলে, আমরা কি সত্য জানার সাহস রাখি?

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।

(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।

বিপি/এসএম

 

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি