‘বিষাদ-সিন্ধু’: ইতিহাসের দলিল নাকি সাহিত্যিক সৃষ্টি?
ছবি: পেক্সেলস
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: বাংলা সাহিত্যে কারবালার ঘটনা নিয়ে রচিত সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ অন্যতম। ১৮৮৫ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে তিন খণ্ডে প্রকাশিত এই উপন্যাস শুধু সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দীর্ঘদিন ধরে বাংলার মুসলিম সমাজে কারবালার কাহিনি জানার একটি জনপ্রিয় উৎসে পরিণত হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় এই গ্রন্থ কি প্রকৃত ইতিহাসের প্রতিফলন, নাকি ইতিহাসকে ভিত্তি করে নির্মিত একটি সাহিত্যকর্ম?
ইতিহাস ও উপন্যাসের সীমারেখা
ইতিহাসের মূল ভিত্তি নির্ভরযোগ্য দলিল, প্রত্যক্ষ বর্ণনা ও গবেষণালব্ধ তথ্য। অন্যদিকে উপন্যাসে লেখকের কল্পনা, চরিত্র নির্মাণ এবং নাটকীয় উপস্থাপনার স্বাধীনতা থাকে। ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভূমিকাতেই মীর মশাররফ হোসেন উল্লেখ করেছেন, সাহিত্যিক প্রয়োজনে তিনি কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন।
তবু সময়ের সঙ্গে অনেক পাঠকের কাছে উপন্যাসের বিভিন্ন ঘটনা বাস্তব ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে সাহিত্যিক বর্ণনা ও ঐতিহাসিক সত্যের পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।
জয়নবকে ঘিরে আখ্যান কতটা ঐতিহাসিক?
উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জয়নবকে কেন্দ্র করে ইয়াজিদের আকাঙ্ক্ষা এবং তার জেরে সংঘাতের গল্প। সেখানে দেখানো হয়েছে, ইমাম হাসান (রা.)-এর সঙ্গে জয়নবের বিয়ে উমাইয়া শাসকদের সঙ্গে আহলে বাইতের বিরোধকে আরও তীব্র করে তোলে।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই ঘটনার পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। গবেষকদের মতে, কারবালার মূল দ্বন্দ্ব ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; বরং ক্ষমতার উত্তরাধিকার, ন্যায়বিচার ও শাসনব্যবস্থাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও নৈতিক মতপার্থক্য ছিল এর কেন্দ্রবিন্দু।
পুঁথি সাহিত্যের প্রভাব
‘বিষাদ-সিন্ধু’তে নানা অলৌকিক ও আবেগঘন বর্ণনা রয়েছে। বিষক্রিয়ার পর শরীরের পরিবর্তন, যুদ্ধক্ষেত্রের অতিপ্রাকৃত ঘটনা কিংবা নাটকীয় সংলাপ—এসব উপস্থাপনা মধ্যযুগীয় পুঁথি সাহিত্যের প্রভাব বহন করে।
গবেষকদের মতে, মীর মশাররফ হোসেন সেই প্রচলিত পুঁথির ধারাকেই আধুনিক বাংলা গদ্যে রূপ দিয়েছেন। ফলে গ্রন্থটি ইতিহাসের চেয়ে সাহিত্যিক ও লোককাহিনিনির্ভর বৈশিষ্ট্য বেশি ধারণ করেছে।
সিমারের চরিত্র কতটা বাস্তব?
উপন্যাসে সিমারকে চরম নিষ্ঠুরতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলার গ্রামীণ সমাজে ‘সিমার’ নামটি দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠুর ব্যক্তির প্রতিশব্দ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
তবে ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে ঠিক কার হাতে শহীদ হতে হয়েছিল, সে বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। যদিও সিমার উমাইয়া বাহিনীর একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন, তবুও উপন্যাসে তাঁর চরিত্রকে যেভাবে একমাত্র খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়।
বাংলা মুসলিম সমাজে প্রভাব
সমালোচনা থাকলেও ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক পরিচয় গঠনে এই গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
তবে অনেক গবেষকের মতে, এর জনপ্রিয়তার কারণে কারবালার রাজনৈতিক, আদর্শিক ও নৈতিক দিকগুলো সাধারণ পাঠকের কাছে আড়ালে থেকে গেছে। বেদনা ও ত্যাগের আবেগ যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, ন্যায়বিচার ও আদর্শের সংগ্রাম ততটা আলোচিত হয়নি।
সচেতন পাঠকের করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বিষাদ-সিন্ধু’কে একটি মূল্যবান সাহিত্যকর্ম হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত। একই সঙ্গে কারবালার প্রকৃত ইতিহাস জানতে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও গবেষণারও আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন। সাহিত্য এবং ইতিহাস - দুইয়ের নিজস্ব অবস্থান রয়েছে; একটিকে অন্যটির বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বিপি/এসআর
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
জীবন, প্রকৃতি ও অস্তিত্বের ভাষায় মোহাম্মদ আশিকুর রহমানের চারটি কবিতা
সঙ্গীত একাডেমি