টেক্সাস ও ক্যালিফোর্নিয়ার মসজিদে ভাঙচুরের ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদার

আবু সাবেত: টেক্সাস ও ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু মসজিদে গ্রাফিতি ভাঙচুরের পর মুসলিম নেতারা সেখানে তাদের পবিত্র উপাসনালয় এবং সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান পদক্ষেপ আরও জোরদার করেছেন।
এই ঘটনাগুলো এবং তার পরবর্তী সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন অনেক আমেরিকান মুসলিম। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের একটি প্রাণঘাতী হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়, যা হাজার হাজার ফিলিস্তিনির প্রাণ কেড়েছে এবং গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)-এর জাতীয় উপ-পরিচালক এডওয়ার্ড আহমেদ মিচেল বলেন, গত দুই বছর আমেরিকান মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।
গাজায় মৃত্যুর মিছিল, ধ্বংসযজ্ঞ এবং চলমান দুর্ভিক্ষের ছবি দেখতে দেখতে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর মানসিক প্রভাব পড়েছে বলে জানান মিচেল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক মনোভাব বেড়ে যাওয়াও তাদের উদ্বিগ্ন করেছে।
তিনি বলেন, এই ঘৃণার সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্তগুলোর একটি হলো: যুদ্ধ শুরুর পর ইলিনয়ে এক ব্যক্তি ঘৃণাজনিত হামলায় ছয় বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম শিশুকে হত্যা করে এবং তার মাকে আহত করে।
উদ্বেগ ও হতাশা
সাম্প্রতিক ভাঙচুরের ঘটনাগুলো অনেককে উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ করেছে, যদিও এতে তারা খুব একটা বিস্মিত হননি।
রাওয়ান্দ আবদেলঘানি বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে আমরা নিঃসন্দেহে ইসলামোফোবিয়ার ঊর্ধ্বগতি দেখেছি। অস্টিনের ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদগুলোর একটি, নুয়েস মসজিদের বোর্ড সদস্য। যে ধরনের ফিলিস্তিন-বিরোধী এবং অভিবাসী-বিরোধী বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, তা এসব ঘটনার জন্য দায়ী।
নুয়েস মসজিদের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একজন মুখ আংশিকভাবে ঢাকা ব্যক্তি সম্পত্তিতে ডেভিডের তারকা (Star of David) চিহ্ন আঁকছে। সিএআইআর অস্টিন জানায়, একই ধরনের ঘটনা অস্টিনের আরও দুটি মসজিদে ঘটেছে।
সবগুলো ঘটনাই সম্ভবত মে মাসে এক রাতেই ঘটেছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি, যেটিকে তারা “ঘৃণা-প্ররোচিত ঘটনার একটি উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতা” হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা নিরাপত্তা টহল এবং প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে।
সিএআইআর অস্টিন-এর অপারেশন ম্যানেজার শাইমা জায়ান এসব ঘটনাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
দুই সপ্তাহ আগেও ক্যালিফোর্নিয়ার সাউদার্ন ইসলামিক সেন্টারে কেউ গ্রাফিতি আঁকে, যার মধ্যে ডেভিডের তারকা চিহ্নও ছিল বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রটির মুখপাত্র ওমর রিচি। রিচি নিজে লস অ্যাঞ্জেলস পুলিশ বিভাগের একজন রিজার্ভ অফিসার।
রিচি বলেন, গাজায় চলমান গণহত্যা ও ফিলিস্তিন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাটি একটি হামলার মতোই মনে হয়েছে।
কিছু বিষয় এখনো অমীমাংসিত। লস আঞ্জেলেস পুলিশ জানিয়েছে, তারা এই ঘটনায় ভাঙচুর ও ঘৃণাজনিত অপরাধের তদন্ত শুরু করেছে এবং অতিরিক্ত টহল দিচ্ছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজন কিংবা সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য চিহ্নিত হয়নি। তারা আরও জানিয়েছে, ধর্মীয় নয় এমন কিছু স্থানেও আক্রমণ হয়েছে।
অস্টিন পুলিশ বিভাগ এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
আবদেলঘানি বলেন, গত বছর তিনটি ঘটনার পর নুয়েস মসজিদ ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা ক্যামেরা বাড়িয়েছিল—তার মধ্যে একটি ছিল মসজিদে পাথর ছোড়ার ঘটনা। মে মাসের ভাঙচুরের পর তারা রাত্রীকালীন নিরাপত্তা রক্ষীও যুক্ত করেছে।
নুয়েস মসজিদটি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছে “বাসা থেকে দূরের বাসা” হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে তারা ধর্মীয় শিক্ষা পায়, অন্য মুসলিমদের সঙ্গে দেখা করে এবং আশ্রয় খুঁজে পায়—বিশেষ করে যখন গত বছর ক্যাম্পাসে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হয়, তখন এই মসজিদ ছিল তাদের জন্য আশ্রয়স্থল।
সিএআইআর জানিয়েছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তাদের দপ্তরগুলোতে ৮,৬৫৮টি অভিযোগ এসেছে, যা ১৯৯৬ সাল থেকে সংস্থাটির প্রথম নাগরিক অধিকার প্রতিবেদন প্রকাশের পর সর্বোচ্চ সংখ্যা। ২০২৪ সালের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে।
তারা বলছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমসহ বিভিন্ন পটভূমির মানুষ 'গণহত্যা বিরোধী অবস্থানের জন্য লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, 'দ্বিতীয় বছরের মতো, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সমর্থনে পরিচালিত গাজা গণহত্যা যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার ঢেউ তৈরি করেছে।'
ইসরায়েল অবশ্য গাজায় গণহত্যার অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। গাজা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৫৯,০০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। হামাসের ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের আক্রমণে প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত ও ২৫০ জন অপহৃত হয়।
বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বহু ক্ষেত্রে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুসলিম ও ইহুদি অধিকার সংগঠনগুলো তাদের সদস্যদের ওপর হয়রানি, বৈষম্য ও শারীরিক হামলার রিপোর্ট বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিউ রিসার্চ সেন্টার জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৭০% মুসলিম এবং ৯০% ইহুদি মনে করেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য বেড়েছে।
সম্প্রতি, গাজায় ইসরায়েলি জিম্মিদের প্রতি সমর্থনে এক বিক্ষোভে আগুন বোমা হামলায় কলোরাডোতে একজন নিহত ও অনেকে আহত হওয়ার পর এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরায়েলি দূতাবাসের দুই কর্মী গুলিতে নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি নেতারা নিরাপত্তা সহায়তার দাবি তুলেছেন।
রাজনৈতিকভাবে, এই যুদ্ধ গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ছায়া দিয়েছিল। অনেক প্রো-প্যালেস্টাইন আমেরিকান ভোটার মনে করেছেন, ইসরায়েলের প্রতি নিজ সরকারের সমর্থন তাদের উপেক্ষিত করেছে। যুদ্ধ ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা বনাম হয়রানি ও বৈষম্যের সীমা নিয়ে বিতর্ক শুরু করেছে।
এমনকি কিছু ইহুদি আমেরিকানদের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে—ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা বা জায়োনিজমের বিরোধিতা আদৌ অ্যান্টিসেমিটিজমের আওতায় পড়ে কিনা তা নিয়ে। ট্রাম্প প্রশাসন প্রো-প্যালেস্টাইন মতাদর্শী বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিতাড়নের চেষ্টা করায় বিতর্ক আরও বেড়ে যায়।
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার ইসলামিক সেন্টার অতীতেও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে—২০২৩ সালে ভাঙচুর এবং ২০১৬ সালে একজন অস্ত্রধারী ব্যক্তির হুমকি ছিল এর মধ্যে অন্যতম।
এসব ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করেন রিচি।
তিনি বলেন, মানুষ এখন বুঝে গেছে—এই শহরে অল্প কিছু ঘটলেই তা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। দুই পক্ষেই প্রচণ্ড আবেগ, প্রচণ্ড অনুভূতি।
মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট সালাম আল-মারায়াতি বলেন, “যদি মানুষ দেখে তারা গ্রাফিতি করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, তাহলে পরের পদক্ষেপ হতে পারে মসজিদে আগুন বোমা নিক্ষেপ করা, এমনকি উপাসনাকারীদের আক্রমণ করা।”
সহানুভূতির বার্তা ও দ্বার খোলা
আল-মারায়াতি ও অন্যরা বলেন, আক্রান্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানো মানুষদের সংখ্যা প্রশংসনীয়।
তিনি বলেন,আমরা লস অ্যাঞ্জেলসে যা করেছি, সেটিই সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি । আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছি, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।
টেক্সাসের নুয়েস মসজিদে এক সমাবেশে প্রতিবেশী, খ্রিস্টান, ইহুদি ও অন্যান্য মানুষ একত্রিত হয়ে গ্রাফিতি মুছে দেন, স্থানটি পরিষ্কার করেন এবং বাগান করেন, বলেন শাইমা জায়ান।
তিনি বলেন, এটা ছিল একদম অসাধারণ।
জায়ান বলেন, মানুষকে আপন দ্বার এবং হৃদয় উন্মুক্ত করে আমন্ত্রণ জানানোর সময় এটি। আস্থা ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ এটা। অ-মুসলিমদের জন্যও এটা ছিল ভালোবাসা ও সমর্থন দেখানোর এক দারুণ সুযোগ। তারা সত্যিই কিছু করতে চেয়েছিল।
[বাংলা প্রেস বিশ্বব্যাপী মুক্তচিন্তার একটি সংবাদমাধ্যম। স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের জন্য নিরপেক্ষ খবর, বিশ্লেষণ এবং মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজ আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।] বিপি। সিএসআপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
গুলির শব্দে হোয়াইট হাউস অবরুদ্ধ, সরিয়ে নেওয়া হলো সংবাদকর্মীদের
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি