২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে: জাতিসংঘে তারেক রহমান

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৮ এএম
রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে: জাতিসংঘে তারেক রহমান


বাংলাপ্রেস ডেস্ক: রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় সমাধানও মিয়ানমারেই বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এমনটাই জানান তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা  এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে,  তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।  বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে  তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেয়াই  এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে।


পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত  তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্যও আমি জাতিসংঘ  এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে  অদূর ভবিষ্যতে এটি এক মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলেও যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে জানিয়ে অধিবেশনে প্রধনামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দেশের ক্ষেত্রে এই উত্তরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার,  প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মনে করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে  বাণিজ্য সহায়তা ও সম্প্রসারণ  কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে  আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারি।
কোভিড মহামারি বিশ্বের কোটি কোটি  মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তবে বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে,  বিশ্ব সমাজকে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই একের প্রতি অন্যের সহায়তা, সহমর্মিতা,  সহযোগিতা অপরিহার্য।  উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসা-সামগ্রী  ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন  নিশ্চিত করা জরুরি।  যাতে এগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হয়।

অধিবেশনে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী।  ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন।  নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং  নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।  নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ  সম্প্রসারিত করেছে।  স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে  শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।

শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয় সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায় যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে।  সেই লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড এর মত বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে।

প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা  'ফ্যামিলি কার্ড'কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে। প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও  সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে বলেও যোগ করেন তিনি।

আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে গড়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স,বায়ো-টেকনোলোজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।  এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ  সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।

আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন  আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের  বিভাজনে পরিণত হোক।  বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে।  একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর,  দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে  সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে।  সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে  বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়  এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ  এখন সময়ের দাবি।

ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনুরুত্থান হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় নতুন বাংলাদেশের কর্মযজ্ঞে সহযোগীদের পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি। এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের অবসান ঘটিয়ে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে।  ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া  গুম খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায়  গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করছে।  ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ  মেরামতের জন্য সরকার রিকভারি, রিস্টোরেশন এবং রিকন্সট্রাকশন অর্থাৎ থ্রি-আর কৌশল অনুসরণ করছে।

বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত।  ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোযে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।  ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি  এবং বাংলাদেশকে 'ম্যানুফ্যাকচারিং হাব' হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।  এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট আপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থ বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি'র 'লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড'  এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি  এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে। সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে এবং একইসঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন  এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে  শিক্ষাখাতে জিডিপি বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা অংশীদারিত্ব  উদ্ভাবন এবং দেশি বিদেশী বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই।


বিপি/কেজে

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি