
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: চীন বাংলাদেশ থেকে দ্রুত রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার পক্ষপাতি। এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। বৃহস্পতিবার বেজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চীনা প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এই মনোভাব ব্যক্ত করা হয়। খবর বাসস, বিডিনিউজ ও বাংলা নিউজের।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার বেজিংয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বেজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তিয়েনআনমেন স্কয়ারের পশ্চিম পাশে এর অবস্থান। আইন প্রণয়ন, ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠকসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলো সেখানে হয়ে থাকে। সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে শেখ হাসিনা গ্রেট হল অব পিপলে পৌঁছলে তাকে সেখানে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। লি কেকিয়াং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানান। দুই প্রধানমন্ত্রী নিজ প্রতিনিধিদলের সদস্যদের একে অন্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে চীনের তিন বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। চীনা প্রধানমন্ত্রীকে সঙ্গে করে শেখ হাসিনা মঞ্চ থেকে সালাম গ্রহণ করেন। পরে তিনি গার্ড পরিদর্শন করেন। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। অভিবাদন জানানো হয় তোপ ধ্বনির মাধ্যমে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভায় যোগদানসহ চীনা শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ১ জুলাই ৫ দিনের সফরে চীনে যান। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে চীন দেশটির সরকারকে সম্মত করতে চেষ্টা করবে বলে বেজিং ঢাকাকে আশ্বস্ত করেছে। বৈঠকে চীনের প্রধানমন্ত্রী এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দ্রুত সমাধানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, এতে কোন সন্দেহ নেই যে এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। লি কেকিয়াং দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে এ সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, চীন সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চীনা প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এই মনোভাব ব্যক্ত করা হয়।
চীন বাংলাদেশ থেকে দ্রুত রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার পক্ষপাতি। এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। বৃহস্পতিবার বেজিংয়ে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহীদুল হক একথা বলেন। তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই চীনের বন্ধু। আমরা এর আগে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে দু’দেশকে সহায়তা করেছি এবং আমরা আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখব। চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দু’দেশকে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান বের করতে হবে। এ প্রসঙ্গে কেকিয়াং উল্লেখ করেন যে, চীন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দু’বার মিয়ানমারে পাঠিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনে আমরা আবারও আমাদের মন্ত্রীকে মিয়ানমারে পাঠাব। শহীদুল হক বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের কারণে এই শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, যতই সময় যাবে এই সমস্যা ততই বড় আকার ধারণ করবে এবং এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হবে। মিয়ানমারকে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের করার কিছুই নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা করেছে। আমরা এ ব্যাপারে সব ধরনের প্রয়াস চালিয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে চায় না। কারণ, তারা শঙ্কিত যে তাদের ওপর আবারও নৃশংসতা চালানো হবে। এই শঙ্কা দূর করতে এবং রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে, মর্যাদা ও নিজস্ব পরিচয়ে নিজ দেশে ফেরত যেতে পারে সেজন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে চীনের ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, তাদের জমি-সম্পত্তির ওপর অবশ্যই তাদের অধিকার থাকতে হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর দেশ এটা বুঝতে পেরেছে যে রোহিঙ্গা সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চীনের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সঙ্কটে মানবিক সাড়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ॥ পণ্যের বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ থেকে আমদানি বাড়াতে চীনা ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি বস্ত্র ও চামড়া, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগ করার সুযোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। চীন সফররত প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার বিকেলে বেজিংয়ে চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন অংশীদার চীন। নির্মাণ, গতানুগতিক ও বিকল্প বিদ্যুত উৎপাদন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীনা কোম্পানি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার চীনের সঙ্গে এক হাজার ২৪০ কোটি ডলারের বাণিজ্যের তথ্য তুলে ধরেন তিনি। তবে এই বাণিজ্যের বেশিরভাগই যে চীন থেকে আমদানি, তাও বলেন শেখ হাসিনা। এ সময় চীনে পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে মাত্র ৬৯ কোটি ৫ লাখ ডলার, যা দুই দেশের মোট বাণিজ্যের ১০ শতাংশেরও কম। আর সদ্য বিদায়ী গত অর্থবছরের ১১ মাসে চীনে রফতানি হয়েছে ৭৮ কোটি ডলারের পণ্য। চীনের ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি আশা করব, রফতানিযোগ্য পণ্য বৈচিত্র্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে সামনের দিনগুলোতে আপনারা বাংলাদেশ থেকে আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াবেন।’ এছাড়া বিনিয়োগেরও অনেক খাত আছে। বিশেষ করে বস্ত্র ও চামড়ার মতো শিল্প খাত এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালকা প্রকৌশলের মতো মাঝারি ও ভারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। চীনে রফতানি হওয়া বাংলাদেশী পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, মাছ ও কাঁকড়া, প্লাস্টিক পণ্য, ফুল, সবজি, ফল, মসলা ও তামাক। বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রক্রিয়াজাত চামড়ার ৬০ শতাংশের বেশি চীনে রফতানি হয়। অপ্রক্রিয়াজাত চামড়ারও বড় একটি অংশ যায় দেশটিতে।
চীনের বাজারে এশিয়া-প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপটা) আওতায় ৮৩ পণ্যে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় আরও প্রায় ৫ হাজার পণ্যে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পেলেও তৈরি পোশাকসহ দেশের প্রধান প্রধান রফতানি পণ্য অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বাংলাদেশের রফতানি বাড়ছে না। তবে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে ‘জিরো ট্যারিফ স্কিম’ নামে একটি সুবিধা চালু করার কথা রয়েছে, যাতে দেশটিতে রফতানিযোগ্য ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। এখন ৬৫ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে চায়না কাউন্সিল ফর প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি)।
বেজিংয়ে সিসিপিআইটির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে চীনের ২৬টি বড় কোম্পানি ও কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা অংশ নেন। এদের মধ্যে বক্তব্য দেন সিসিপিআইটি চেয়ারপার্সন ও চায়না ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রাক্টরস এ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ফ্যাং কুইচেন, চায়না রেলওয়ে ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ কোম্পানির চেয়ারম্যান গান বাইছিয়ান, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন গ্রুপের ওভারসিজ অপারেশনের প্রেসিডেন্ট কাও বাওগাং, গ্রুপের চায়না স্টেইট কন্ট্রাক্টরস ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জু ইয়ং, হুয়াওয়ে টেকনোলজিস কর্পোরেশনের কোম্পানির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জেং চেংগাং প্রমুখ। বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স- বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট রোকেয়া আফজাল রহমান, এফবিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট মুনতাকিম আশরাফ ও সিদ্দিকুর রহমান।
উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রী বেসরকারী শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, চীনের উদ্যোক্তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন। তারা বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, বিদ্যুত, নির্মাণ শিল্পসহ কয়েকটি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গোলটেবিল বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেন সিসিপিআইটি চেয়ারপার্সন ও চায়না ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রাক্টরস এ্যাসোশিয়েশনের চেয়ারম্যান ফ্যাং কুইচেন। শেখ হাসিনা সিসিপিআইটি পরিদর্শন বইতেও সই করেন।
বিপি।সিএস
[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]