নিউ ইয়র্ক সিটিতে ন্যূনতম মজুরি ধাপে ধাপে ঘণ্টায় ৩০ ডলারে বাড়ানোর পরিকল্পনা
নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি
নোমান সাবিত: নিউ ইয়র্ক সিটিকে প্রায়ই বলা হয় ‘স্বপ্নের নগরী’। অনেকের জন্যই এমন এক বাস্তবতা যেখানে বেতন হাতে পাওয়ার আগেই তা প্রায় শেষ হয়ে যায়। এখন সিটি হলে উত্থাপিত একটি বড় প্রস্তাব লক্ষ লক্ষ ন্যূনতম মজুরি-নির্ভর কর্মীর আয়ের কাঠামো বদলে দিতে পারে।
মার্চের শুরুতে নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিল সদস্য সান্দ্রা নার্স 'আমাদের শহরের জন্য ৩০ ডলার' নামে একটি বিল উত্থাপন করেন, যার লক্ষ্য ধাপে ধাপে শহরের ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ঘণ্টায় ৩০ ডলার করা। নার্সের মতে, বর্তমানে ঘণ্টায় ১৭ ডলার ন্যূনতম মজুরি অনেক নিউ ইয়র্কবাসীর জন্য মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রায় সপ্তাহে ৫০০ ডলার হাতে পাওয়া আয় দিয়ে জীবন চালানোকে তিনি 'প্রায় প্রতিটি সপ্তাহেই অধিকাংশ মানুষের জন্য একটি সংকট' বলে উল্লেখ করেছেন, যা দ্য মিরর-এ প্রকাশিত তার মন্তব্যে উঠে এসেছে।
এই পরিকল্পনা কর্মীদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বস্তি এনে দিতে পারে বলে মনে করা হলেও, একই সঙ্গে নিয়োগ, পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে ছোট ব্যবসাগুলোর পক্ষে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে কিনা—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ধাপে ধাপে ঘণ্টায় ৩০ ডলারের পথে
প্রস্তাবিত আইনটি হঠাৎ করে বড় বৃদ্ধি না এনে ধাপে ধাপে মজুরি বাড়ানোর পরিকল্পনা দিয়েছে, যাতে আগামী কয়েক বছরে নিউইয়র্ক সিটির ন্যূনতম মজুরি ৩০ ডলারে পৌঁছায়।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী
৫০০-এর বেশি কর্মী রয়েছে এমন কোম্পানিগুলোকে ২০২৭ সালের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ২০ ডলার করতে হবে এবং পরে তা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ ডলারে পৌঁছাতে হবে।
৫০০-এর কম কর্মী রয়েছে এমন ছোট ব্যবসাগুলোকে কিছুটা বেশি সময় দেওয়া হবে। তাদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি ২০২৮ সালের মধ্যে ২১.৫০ ডলার এবং পরে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০৩২ সালের মধ্যে ৩০ ডলার করা হবে।
তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বড় শহরে ইতিমধ্যেই নিউইয়র্কের বর্তমান ন্যূনতম মজুরির চেয়ে বেশি মজুরি চালু রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ:
সিয়াটল: প্রায় ২১.৩০ ডলার, ডেনভার: প্রায় ১৯.২৯ ডলার, ফ্ল্যাগস্টাফ, অ্যারিজোনা: প্রায় ১৮.৩৫ ডলার, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শহর এখনও ঘণ্টায় ৩০ ডলারের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেনি। নার্সের মতে, মজুরি নীতির ক্ষেত্রে নিউ ইয়র্ক অন্যান্য শহরের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন,'আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। অথচ ওই শহরগুলোর জীবনযাত্রার খরচ নিউ ইয়র্কের তুলনায় অনেক কম।'
তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, ঘণ্টায় ৩০ ডলার মজুরিও হয়তো শহরে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট হবে না। ইকোনমিক পলিসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্ক মহানগর এলাকায় একজন একক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৌলিক ব্যয় মেটাতে বছরে প্রায় ৮৩,২৬২ ডলার, অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ৪০ ডলার আয় প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
প্রস্তাবিত মজুরি বৃদ্ধিকে অনেক নিয়োগকর্তা আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন না বিশেষ করে যেসব খাতে লাভের পরিমাণ আগেই সীমিত।
নিউ ইয়র্ক স্টেট রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মেলিসা ফ্লাইশুট দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, মহামারির পর অনেক রেস্টুরেন্ট এখনও লাভ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে, ফলে অতিরিক্ত শ্রম ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি আমরা এখন এক ধরনের সীমার কাছে পৌঁছে গেছি। পিৎজার এক টুকরো বা চিজবার্গারের জন্য কত দাম নেওয়া যায়—তারও একটা সীমা আছে।
বড় চেইন প্রতিষ্ঠানগুলোও গ্রাহকদের আর্থিক চাপে পড়ার লক্ষণ দেখছে। চিপোটলের সিইও স্কট বোয়াটরাইট জানান, যেসব গ্রাহকের আয় বছরে এক লাখ ডলারের কম যারা কোম্পানির আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ—তারা এখন কম ঘনঘন রেস্টুরেন্টে আসছেন।
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য চাপ আরও বেশি। কুইন্সে বার্মিজ কফি-চা বিতরণ ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছেন মো চ্যান। তার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে দুইজন খণ্ডকালীন কর্মী কাজ করেন।
তিনি বলেন, আমি যতই চাই না কেন ঘণ্টায় ৩০ ডলার দিতে, আমাদের কাছে সেই টাকা নেই।'
মেয়র মামদানির প্রতিক্রিয়া
ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো ছিল নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির নির্বাচনী প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। তার প্রশাসনও কর্মীদের আয় বাড়ানোর উদ্যোগে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
মেয়রের কার্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, মেয়র মামদানি বিশ্বাস করেন যে প্রত্যেক নিউ ইয়র্কবাসীরই জীবিকা নির্বাহের উপযুক্ত মজুরি পাওয়া উচিত।'
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন এই নির্দিষ্ট আইনটি পর্যালোচনা করছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলায় শহরের সব ধরনের নীতিগত উপায় ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে ব্যবসায়ী নেতারা এখনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কুইন্স চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট টম গ্রেচ বলেন, যদি কেউ ঘণ্টায় ৩০ ডলার পান, তাহলে পূর্ণকালীন কাজ করলে বছরে প্রায় ৬০ হাজার ডলার আয় হবে—আর সুবিধা-ভাতা যোগ হলে তা ৮০ হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
সমালোচকরা এখন এই প্রস্তাবের সম্ভাব্য প্রভাব—বিশেষ করে চাকরি ও স্থানীয় ব্যবসার ওপর—ভালভাবে মূল্যায়নের জন্য একটি বিস্তারিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করার দাবি তুলেছেন।
এ মুহূর্তে বিলটি পর্যালোচনাধীন রয়েছে। ফলে নিউ ইয়র্কবাসী এখন অপেক্ষা করছেন এটি বাস্তবায়নের পথে এগোয় কিনা তা দেখার জন্য।
তবে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলেও মজুরি বৃদ্ধি ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। তাই নীতিগত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকাকালীন অনেক কর্মীকেই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত আর্থিক কৌশল যেমন অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, নিয়মিত বিল নিয়ে দরকষাকষি করা বা আয় বাড়ানোর নতুন উপায় খোঁজা নিয়ে ভাবতে হবে।
* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের বৈঠক ভারতে
নিউ ইয়র্কে দ্বিতীয় বাড়ির ওপর কর আরোপে মামদানির বিপক্ষে আদালতের রায়
গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনে আলোচনা হবে: জয়সোয়াল
সঙ্গীত একাডেমি