২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গণমাধ্যম বুঝতেই পারছে না কার প্রতি সহানুভূতি দেখানো উচিত

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২০ পিএম
গণমাধ্যম বুঝতেই পারছে না কার প্রতি সহানুভূতি দেখানো উচিত

ছাবেদ সাথী'র উপনয়ন

ছাবেদ সাথী

গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তবে সবচেয়ে ক্ষতিকর কারণগুলোর একটি হলো এর আদর্শিক একরূপতা।

একটি ছোট কিন্তু প্রভাবশালী পেশাজগতের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন একই ধরনের বিশ্বাস পোষণ করেন, একই বিষয় নিয়ে কথা বলেন, একই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েন, একই সামাজিক পরিমণ্ডলে চলাফেরা করেন, একই অনুষ্ঠান দেখেন, একই বই পড়েন এবং একই রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন—তখন তাঁদের মধ্যে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হওয়া খুবই সহজ। ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে আত্মসচেতনতাও হারিয়ে যেতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে দ্য নিউ ইয়র্কার-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বিবেচনা করা যেতে পারে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে পেশাগতভাবে যুক্ত একজন অনাগরিককে গভীর সহানুভূতির সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ডেইসি গনজালেজ এল সালভাদর থেকে পর্যটক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। ২০০১ সালে একাধিক ভূমিকম্পের পর তাঁর দেশ টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস বা TPS-এর আওতায় এলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যান। এখন সেই কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাঁকে দেশ ছাড়তে হতে পারে।

নিউ ইয়র্কার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অভিবাসীর তুলনায় গনজালেজের পেশা তাঁকে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কাছাকাছি নিয়ে যায়। তিনি সংহতি কৌশল নামের একটি রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অংশীদার এবং ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হতে সহায়তা করেন। চলতি নির্বাচনী চক্রে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্ট ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসনাল ক্যাম্পেইন কমিটি (ডিসিসিসি), যারা প্রতিষ্ঠানটিকে এ বছর ১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই লেখকের প্রশ্ন: গণমাধ্যমের নিজস্ব সামাজিক ও আদর্শিক গণ্ডি কি এতটাই সংকীর্ণ হয়ে গেছে যে, তারা আর বুঝতে পারছে না কোন ব্যক্তিকে জনসমক্ষে সহানুভূতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করলে সাধারণ পাঠকের কাছে তা কীভাবে প্রতিভাত হতে পারে?

গনজালেজ যুক্তরাষ্ট্রে অনাগরিক হিসেবে প্রায় ২৫ বছর কাটিয়েছেন, যার প্রায় এক দশক রাজনৈতিক পরামর্শক হিসেবে। তিনি বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক প্রচারণা, ব্যালট গণভোট এবং ডেমোক্র্যাটিক নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করেছেন। নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বৈধতার কয়েকটি পথও তিনি অনুসন্ধান করেছিলেন—যার মধ্যে এইচ-১বি লটারিও ছিল—কিন্তু কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান পাননি।

নিউ ইয়র্কার তাঁর সম্ভাব্য দেশত্যাগকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে। কিন্তু মূল নিবন্ধের লেখকের যুক্তি হলো, একজন অনাগরিক যিনি পেশাগতভাবে মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করেন, তাঁর পরিস্থিতিকে সবাই একইভাবে ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখবেন—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

এআই ও কেনিয়ার ‘অ্যাসাইনমেন্ট লেখক’

লেখক এরপর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর আরেকটি প্রতিবেদনের উদাহরণ দিয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের কারণে কেনিয়ার এমন কিছু মানুষের আয় কমে গেছে, যারা বিদেশি শিক্ষার্থীদের হয়ে অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রবন্ধ লিখতেন।

প্রতিবেদনের অন্যতম চরিত্র তেরেসিওস বুন্ডি একসময় মার্কিন শিক্ষার্থীদের জন্য একাডেমিক পেপার লিখে ভালো আয় করতেন। টাইমস-এর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের হয়ে কাজ লিখে দেওয়ার নৈতিকতা নিয়ে চিন্তা করতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনে করতেন সেটি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, এ ধরনের লেখকদের কেউ কেউ ভালো আয় করতেন—নতুন গাড়ি কিনতেন, সর্বশেষ স্মার্টফোন ব্যবহার করতেন এবং ব্যয়বহুল বিনোদনের সুযোগ নিতেন। কিন্তু জেনারেটিভ এআই সহজলভ্য হওয়ার পর তাঁদের ব্যবসায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।

টাইমস বিষয়টিকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের নিম্নস্তরের কিছু কাজ এআই কীভাবে বিলুপ্ত করছে, তার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিল।

মূল নিবন্ধের লেখকের আপত্তি এখানেই। তাঁর মতে, এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থান হারানোর বিষয়টি তুলে ধরার জন্য এমন মানুষের উদাহরণ বেছে নেওয়া যেত, যাঁদের কাজ একাডেমিক অসততার সঙ্গে যুক্ত নয়।

অভিবাসন ও অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদনের ভাষা

এরপর লেখক নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর আরও কয়েকটি অভিবাসন ও অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদনের সমালোচনা করেন।

এর মধ্যে টেনেসিতে অবৈধ জুয়া ও মাদকসংক্রান্ত একটি অভিযানের পর অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছিল।

আরেকটি প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন গুয়াতেমালার নাগরিক রোমিও পেরেজ-ব্রাভো। মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একজন মার্কিন নাগরিকের পরিচয় চুরি এবং গুরুতর পরিচয় চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে।

পরিচয় চুরির ফলে ভুক্তভোগী ব্যক্তির আর্থিক ও আইনি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু টাইমস তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম দিয়েছিল—'দুজন মানুষ। একটিই পরিচয়। দুজনেই এর মাশুল দিয়েছেন।'

মূল নিবন্ধের লেখকের বক্তব্য, এমন শিরোনাম অপরাধী ও ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে পাশাপাশি দাঁড় করায়, যা পাঠকের কাছে নৈতিক পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে দিতে পারে।

গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিকেও সহানুভূতির কেন্দ্রে?

লেখক নিউ ইয়র্কার-এর অরভিল এটোরিয়াকে নিয়ে করা আরেকটি প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করেন।

এটোরিয়া ছিলেন জ্যামাইকার নাগরিক এবং দীর্ঘদিন নিউ ইয়র্কে বসবাস করেছিলেন। তাঁকে আইসিই হেফাজতে নিয়ে আফ্রিকার এসওয়াতিনিতে পাঠানো হলে তিনি শিকল পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাকে দাসত্বের ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

কিন্তু মূল নিবন্ধের লেখক উল্লেখ করেন, এটোরিয়া সশস্ত্র ডাকাতি ও হত্যাসহ গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হয়েছিলেন এবং নিউ ইয়র্কে তাঁর দীর্ঘ সময়ের একটি বড় অংশ কারাগারে কেটেছিল।

ফলে লেখকের প্রশ্ন—গণমাধ্যম যখন অভিবাসন নীতির মানবিক প্রভাব তুলে ধরতে চায়, তখন কেন বারবার এমন ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে বেছে নেয় যাঁদের অতীত গুরুতর অপরাধ বা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত?

সমস্যা কি সাংবাদিকতার ‘বুদ্‌বুদে’?

এই প্রবণতা ব্যাখ্যা করতে লেখক প্রয়াত চলচ্চিত্র সমালোচক পলিন কেইলের ১৯৭২ সালের একটি বহুল আলোচিত মন্তব্য স্মরণ করেছেন।

রিচার্ড নিক্সনের বিপুল নির্বাচনী জয়ের পর কেইল বলেছিলেন:

'আমি এক বিশেষ ধরনের জগতে বাস করি। নিক্সনকে ভোট দিয়েছেন—এমন মাত্র একজন মানুষকে আমি চিনি।

নিক্সন সে বছর প্রায় ৬০ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট এবং ৫২০টি ইলেক্টোরাল ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।

কেইলের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য ছিল তাঁর নিজের সামাজিক পরিমণ্ডল বৃহত্তর আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে কতটা আলাদা ছিল, সেটি স্বীকার করা।

মূল নিবন্ধের লেখকের মতে, আধুনিক সংবাদশিল্পে সেই ধরনের বিচ্ছিন্নতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

গণমাধ্যমের কাজ কেবল এমন মানুষের গল্প বলা নয় যাঁদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সামাজিক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মিল রয়েছে। একইভাবে কোনো ব্যক্তির অপরাধের ইতিহাস থাকলেই তাঁর মানবিক বা আইনি অধিকার নিয়ে প্রতিবেদন করা যাবে না—এমনও নয়।

বরং সাংবাদিকতার বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাসঙ্গিক সব তথ্য পাঠকের সামনে রাখা—যাতে পাঠক নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

কোনো অভিবাসীর দুর্দশা তুলে ধরলে তাঁর প্রাসঙ্গিক অপরাধের ইতিহাস গোপন করা উচিত নয়। আবার অপরাধের ইতিহাস তুলে ধরার সময় তাঁর আইনগত অধিকার বা সরকারি ব্যবস্থার সম্ভাব্য অন্যায়ও উপেক্ষা করা উচিত নয়।

মূল নিবন্ধটির শেষ বক্তব্য হলো, সংবাদমাধ্যম যদি সাধারণ পাঠকের মূল্যবোধ, উদ্বেগ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যায়, তাহলে সেটি শুধু বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে না—দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও টিকে থাকার জন্যও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস। 

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি