ফেলে আসা গাজীপুরের স্মৃতি
– কানিজ ফাতেমা
তেরোটি বছরের মায়া কাটিয়ে অবশেষে নাড়ির টানে ফিরে যেতেই হচ্ছে জন্মস্থানে (দিনাজপুর)। যদিও জীবনের সকল প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সব তোমাকে জুড়েই।
সারা জীবনের সকল শিক্ষক, সহপাঠী-বন্ধু সবাইকে ছেড়ে গিয়ে মনে হবে বিশাল এক পৃথিবী হারিয়েছি আমি নিশ্চয়ই।
পরিচিত আস্তানাগুলোতে আর বেখেয়ালে খোশগল্প করা হবে না, বন্ধুদের নিয়ে করা হবে না একান্ত আলাপ, মেলাতে বসা হবে না জীবনের বিশৃঙ্খল সব জটিলতর সমীকরণ!
অসময়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত জীবনের ভারে নুইয়ে গিয়ে আর মাথা রাখা হবে না পরিচিত-বন্ধুসুলভ কাঁধগুলোতে, অসংকোচে পথ আটকে দাঁড়ানো হবে না এক গাল হেসে, পাওয়া হবে না অকৃত্রিম ভালোবাসা বহনকারী হৃদয়গুলোর উষ্ম আলিঙ্গন!
কি করেই বা ভুলবো নিকটতম প্রতিবেশীর অকৃত্রিম সেই স্নেহ, মৃদু শাসন-বারণ আর ঠাট্টাগুলোকে।
কবি নজরুল স্মরনী দিয়ে আর সোল্লাসে হেঁটে যেতে পারবো না সময় কে পেছনে ফেলে। রাস্তায় কোনো পরিচিত মুখ দেখে আর থমকে যাওয়া হবে না 'ভালো আছি' বলে।
কড়া রৌদ্রে হঠাৎ মাথা ধরলে- কেবল পনেরো টাকায় এক কাপ স্বর্গীয় সুখে ডুব দিতে যাওয়া হবে না জোড়পুকুরের বিখ্যাত সেই চায়ের দোকানে। পাঁচ বছরের পরিচিত, অমৃত স্বাদের সেই ফুচকা খাবার লোভে আর লেবুবাগানে গিয়ে অপেক্ষা করা হবে না, আঙ্কেল আছে কিনা বারবার খোঁজও নেয়া হবে না।
স্টার কাচ্চির অতুলনীয় মোরগ পোলাওয়ের স্বাদ ভুলে যেতেই হবে। ভরদুপুরে ইচ্ছে হলেই আর ঘন্টা ধরে রিকশায় ঘোরা হবে না, অতো আয়েশ করে দেখা হবে না ঝকঝকে নীল আকাশ, শহুরে পথের একপাশে বসন্তের শেষে ফোঁটা শিমুল,পলাশ। দেখে চোখ জুড়ানো হবে না শহরের বুকে এক টুকরো গ্রাম।
মন খারাপ হলেও জয়দেবপুর স্টেশনের ফুটওভারব্রিজ এ গিয়ে বসে থাকা হবে না তীব্র কোলাহলের মাঝে -একাকী নিজেকে নিবিড়ভাবে খুঁজে পেতে।
স্মৃতিতে বারবার ভাসবে কেশরিতা গ্রামে সেই প্রথম নৌকাভ্রমণ। যেদিন মেঘলা আকাশ আর মৃদু ঠান্ডা বাতাস বারবার মনের ক্ষতে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। ছোট্ট একটা শাপলা তুলে আনবার সময়, কাচের নীল চুড়ি থেকে টপ টপ করে পানি ঝরছিল, নৌকাতে বসে খিচুড়ির স্বাদ নিতে নিতে মধ্যবিকেলে প্রথমবার উপভোগ করেছিলাম 'সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমার' কোথাও নেই ঝুমঝুম অন্ধকার তক্ষক ডাকা নিশুতিতে (হারিয়ে গিয়েছি)' ।
নৌকায় ভাসতে ভাসতে শুনছিলাম, ভেসে আসো তুমি (প্রতিচ্ছবি) কি চমৎকার লাগছিলো।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত দেশকে ছেড়ে গিয়ে বিলাপ করেছেন, আর এ হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে প্ৰিয় শহর গাজীপুর, তোমাকে ছেড়ে যেতেই হচ্ছে।
কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন 'আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলা' আর আমি ফিরতে চাই বারবার- গাজীপুর, তোমার কাছে, আবারো আরো শক্ত করে মায়ার বাঁধন বাধঁতে।
কবি যেমন লিখেছেন 'সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি-
এই নদী নক্ষত্রের তলে
সেদিনও দেখিবে স্বপ্ন—
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!'
তেমনটা ভেবে বড়ো অস্বস্তি হচ্ছে যে, আমি বিহনে আমার প্ৰিয় শহরের একটা ধুলোও তার গতিপথ বদলাবে না।
এক মুহূর্তের জন্যেও কোনো কিছুই থমকাবে না।
সবশেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সুভা' গল্পের সেই আবেগপ্রবণ সুভার মতোন শষ্পশয্যা লুটিয়ে পড়ে আমারও বলতে ইচ্ছে করছে 'তুমি আমাকে যাইতে দিয়ো না, মা। আমার মতো দুটি বাহু বাড়াইয়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাখো।'
কানিজ ফাতেমা কলেজ শিক্ষার্থী ও সৌখিক লিখিয়ে
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি
Kaniz Fatema
অসংখ্য ধন্যবাদ লেখাটি যুক্ত করবার জন্য 🌷💛