ধর্ষিত শিশুর মায়ের আর্তনাদ শুনবে কি রাষ্ট্র
।। মিতা রহমান।।
'নিষ্পাপ রামিসাদের অভিশাপে শেষ হয়ে যাবো আমরা। প্রতিবেশীর বিকৃত যৌনলালসার শিকার হয়েছিল শিশুটি। নির্যাতন বা রক্তক্ষরণের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়েই তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে আলামত গোপন ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা ও হাত কেটে ফেলা হয়েছিল।' কতাটা ভয়াবহ সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে এই ঘটনা তারই প্রতিধ্বনী। অন্যদিকে রামিসার পিতা যখন বলে, "আমি বিচার চাই না। কারণ, আপনার বিচার করতে পারবেন না।" তখন রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি তার আস্থাহীনতার কথাই প্রকাশ পায়।
ধর্ষিতার পিতার কন্ঠে রাষ্ট্রের প্রতি হতাশা। একটি ন্যায়বিচারহীন সমাজ ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর এক মর্মস্পর্শী আর্তনাদ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘসূত্রিতা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে একজন ভুক্তভোগী বাবার মনে যে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে, তার বহিঃপ্রকাশ। একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে। যখন সেই রাষ্ট্রে একজন অসহায় পিতা তার কন্যার সম্ভ্রমহানির বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সুবিচার পান না, তখন এই হতাশা কেবল একটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও দুঃখ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি তীব্র অনাস্থা। মামলা দায়ের করার পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, বারবার আদালতে দৌড়াদৌড়ি এবং সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে আসামিদের জামিন পেয়ে যাওয়া বাবাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।
বাংলাদেশের অতি সাম্প্রতিককালের আলোচিত ঘটনা হলো মব। মানুষ সারাক্ষণই এ মবের ভয়ে আতঙ্কে থাকে। কিন্তু, যেভাবে একের পর এক ধর্ষন, বলৎকার হত্যার ঘটনা ঘটছে তাতে জনমনে শঙ্কা তৈরী হচ্ছে ধর্ষন কি মবের চাইতে ভয়বহ ব্যাধিতে পরিনত হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর শত শত শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমেও আসে না। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শিশু হত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা, অপহরণের পর হত্যা কিংবা পারিবারিক সহিংসতায় শিশু মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব অপরাধের বড় অংশেই বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়, আর অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। একটি রাষ্ট্র কতা সভ্য সেই প্রকৃত মানদণ্ড কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নির্ধারিত হয় না। সেই রাষ্ট্র তার শিশুদের কতটা নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মর্যাদা ও সুরক্ষা দিতে পারছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশের বাস্তবতা উদ্বেগজনক। শিশুমৃত্যু, যৌন সহিংসতা, শারীরিক নির্যাতন, শিশুশ্রম, অপুষ্টি, মানসিক চাপ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বিস্তৃত সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, শিশু আইন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার-সবকিছু থাকার পরও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
আজকের বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট বার্তা: ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যার মতো অপরাধে কোনো আপস নয়, কোনো সামাজিক সালিশ নয়, কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়া নয়। আইন সবার জন্য সমান- এই নীতি বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে। কেবল তখনই আমরা বলতে পারব, আরেকটি কিশোরীর জীবন আমাদের উদাসীনতার কাছে হারিয়ে যাবে না। শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ৯০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুর অন্তরে। এ বাংলাদেশকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। বাংলাদেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত ও বঞ্চিত শিশুদের জন্য ঘুণেধরা এ সমাজ ভেঙে এক নতুন সমাজ গড়ার সুকঠিন অঙ্গীকার গ্রহন করতে হবে রাষ্ট্রকে। বিগত চার দশকে দেশের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক ভিত্তিতে পরিবর্তন হয়েছে। এমন বাস্তবতায় শুধু আইন করে ধর্ষণের মতো অপরাধ শূণ্য করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে নৈতিকতার ও মূল্যবোধ চর্চা আরো জোরদার করা জরুরি। আগে শিশুরা শুধু ধর্ষণের শিকার হতো। এখন ধর্ষণের পর শিশুকে মেরে ফেলা হচ্ছে। এটা হিংস্রতা ও বর্বরতা বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত বহন করে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিশুদের রক্ষায় প্রচলিত আইনে সংশোধন আনতে হবে। যে ধরনের শিশু নির্যাতন হোক না কেন, এ ক্ষেত্রে রায় কার্যকরের সময়সীমা ৯০দিনে বেঁধে দিতে হবে। তা হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর কেউ সাহস না পায়।
ধর্ষণ নামক এক ঘৃণ্য সামাজিক ব্যাধি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। ধর্ষণের শিকার হয়ে সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত হয়ে অসংখ্য নারী বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। এখন আবা শিশূদের ধর্ষনের পর নির্মমভাবে হত্যাও করা হচ্ছে। শিশু-নারীদের উপর যারা এ ধরণের পাশবিক আচরণ করছে তারা মানুষ নামের অমানুষ। এদের মনুষ্যত্ব নেই, আছে পশুত্ব। আর এই পশুরা আমাদের মা, বোন, স্ত্রী, কন্যাদের সম্ভ্রমহানি করছে যেখানে সেখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অজপাড়া গাঁয়ের কোন গৃহবধু, এমনকি শিশুরাও এই পশুদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়ে চলছে এদের ধর্ষণ সন্ত্রাস। সমাজের সবাই মিলে এই ধর্ষকদের প্রতিরোধ করতে হবে। শুধু আইনের হাতে থুলে দিলেই হবে না, নিশ্চিত করতে হবে বিচার। আর এদের ব্যাপারে দাবী একটাই, বিচারে দীর্ঘসূত্রীতার জটিল জট ভেঙ্গে দ্রততম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তির নিশ্চয়তা।
ধর্ষকদের রক্ষা নাই, সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।
সোচ্চার হয়ে বলি সবাই, বন্ধ হোক ধর্ষণ
নারী মাতা, নারী বধু, কন্যা এবং বোন।
( লেখক : কবি ও সংগঠক, যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন)
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন